
জন্মদিন এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দর কেক আর তার ওপর জ্বলতে থাকা একগুচ্ছ রঙিন মোমবাতি। আলো নিভিয়ে গান গাওয়া আর এক ফুঁয়ে মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটা আজ গোটা দুনিয়ার অন্যতম প্রধান রেওয়াজ। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন কি, মিষ্টি খাবার হিসেবে কেক আর মোমের আলো নেভানোর এই অদ্ভুত নিয়ম ঠিক কোথা থেকে এল? Getty Images
ইতিহাসবিদদের মতে, বিশেষ দিন উদযাপনের এই চমৎকার ভাবনার প্রথম সূচনা হয়েছিল প্রাচীন মিশরের হাত ধরে। সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং ফারাও বা রাজাদের যেদিন মাথায় রাজমুকুট পরানো হত, সেদিনটিকে বিশেষ মর্যাদায় পালন করা হত। মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, রাজ্যাভিষেকের পর রাজা মানুষ থেকে ঈশ্বরে পরিণত হন এবং এটিই তাঁদের আসল নতুন জন্মের দিন। Getty Images
মিশরীয়দের এই রাজকীয় ধারণার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে মিষ্টি কেকের সংযোগ ঘটিয়েছিল প্রাচীন গ্রিসের মানুষ। তারা তাদের চাঁদের দেবী ‘আর্টেমিস’-কে খুশি করার জন্য গোল চাঁদের মতো দেখতে বিশেষ ধরনের কেক তৈরি করত। খাঁটি মধু আর ময়দা দিয়ে তৈরি এই গোল কেক দেবীর মন্দিরে নৈবেদ্য হিসেবে উৎসর্গ করার মাধ্যমেই কেকের আসল চল শুরু হয়। Getty Images
গ্রিকরাই প্রথম সেই চাঁদের আকৃতির কেকের ওপর জ্বলন্ত মোমবাতি বসানোর রীতি চালু করেছিল। চাঁদের স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল আলোর রূপ ফুটিয়ে তোলাই ছিল কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখার মূল উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, জ্বলন্ত এই পবিত্র শিখা মানুষের মনের ভক্তি ও সব প্রার্থনা সরাসরি স্বর্গের দেবতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। Pexel
মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নেভানোর পেছনের রহস্যটিও গ্রিকদের তৈরি করা এক চমৎকার বিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাদের ধারণা ছিল, মোমবাতি নেভানোর ঠিক পরমুহূর্তে যে ধোঁয়া সোজা আকাশের দিকে উড়ে যায়, তা মানুষের মনের সুপ্ত ইচ্ছেকে ভগবানের কাছে নিয়ে যায়। এই প্রাচীন ভাবনা থেকেই আজকের দিনে মোমবাতি নেভানোর আগে চোখ বন্ধ করে ‘উইশ’ করার নিয়ম চালু হয়েছে। Getty Images
অন্যদিকে জার্মানির ‘কিন্ডারফেস্ট’ নামের এক প্রাচীন প্রথা থেকে জন্মদিনের মোমবাতি আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে শিশুদের জন্মদিনে বিশেষ ধরনের কেক বা রুটির ঠিক মাঝখানে একটি বড় মোমবাতি সারাদিন জ্বালিয়ে রাখা হত। এই একটি জ্বলন্ত শিখা ছিল মানুষের জীবনের আলো ও সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতীক, যা আজ সংখ্যা অনুযায়ী বসানো হয়। Getty Images
ইউরোপের মধ্যযুগে বিশ্বাস করা হত যে, জন্মদিনের দিনে মানুষের ওপর অশুভ আত্মা বা খারাপ শক্তির কড়া নজর থাকে। তাই খারাপ শক্তিকে ভয় দেখিয়ে দূরে রাখার জন্য সারাদিন মোমবাতির আগুন জ্বালিয়ে রাখা হত। পাশাপাশি বন্ধু ও আত্মীয়রা সবাই মিলে খুব চিৎকার-চেঁচামেচি, গান ও আনন্দ করত, যাতে শব্দ শুনে কোনও অশুভ ছায়া কাছে ঘেঁষতে না পারে। Getty Images
এককালে শুধু সমাজের রাজা, ধনী বা ক্ষমতাশালী অভিজাত পরিবারের মানুষরাই ঘটা করে নিজেদের জন্মদিনের আনন্দ উদযাপনের সুযোগ পেতেন। সাধারণ মানুষ তখন কেবল সন্তদের দিন পালন করত, কিন্তু সময়ের নিয়মে সমস্ত ভেদাভেদ মুছে গিয়ে আজ তা সবার উৎসবে পরিণত হয়েছে। তাই পরের বার যখন জন্মদিনে মোমবাতি নেভাবেন, মনে রাখবেন আপনি কিন্তু হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গেই পা মেলাচ্ছেন। Getty Images