
আজকের দিনে জিন্স পরেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন, আর খেয়াল করলে দেখবেন সব জিন্সের ডান পকেটের ঠিক উপরেই থাকে ছোট্ট একটি 'মিনি পকেট'। অনেকেই হয়তো মনে করেন এটি কেবলই ডিজাইনের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় ১৫০ বছরেরও পুরনো এক ইতিহাস। ১৮৭৩ সালে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড 'লেভি স্ট্রস' (Levi Strauss) যখন প্রথম এই জিন্স প্যান্ট বাজারে আনে, তখন থেকেই এই ছোট্ট পকেটের সূত্রপাত ঘটেছিল। Getty Images

উনবিংশ শতাব্দীতে আজকের মতো কবজি ঘড়ি বা রিস্টওয়াচের রমরমা ছিল না, তখন পুরুষদের ফ্যাশন ও প্রয়োজনের মূল অঙ্গ ছিল পকেট ঘড়ি বা 'পকেট ওয়াচ'। কাউবয়, সোনার খনির শ্রমিক কিংবা ট্রেনের চালকরা সেই সময়ে চেইন দেওয়া এই পকেট ঘড়ি ব্যবহার করতেন এবং কাজের সময় ঘড়িটিকে সুরক্ষিত রাখাটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্যান্টের সাধারণ পকেটে রাখলে অন্যান্য জিনিসপত্রের ঘষা লেগে ঘড়ির কাঁচ ভেঙে যাওয়ার বা স্ক্র্যাচ পড়ার ভয় থেকেই যেত। Getty Images

সেই সমস্যার সমাধান করতেই লেভি স্ট্রস এবং দর্জি জ্যাকব ডেভিস জিন্সের ডানদিকের মূল পকেটের ওপর বিশেষ এই অতিরিক্ত পকেটটি সেলাই করে যুক্ত করেছিলেন। এই ছোট পকেটে ঘড়িটি ঠিকঠাক আটকে থাকত এবং নড়চড় হলেও তা কোনওভাবে পড়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়ার সুযোগ থাকত না। সেই কারণেই তৎকালীন সেলাই সংক্রান্ত নথিপত্রে ও ফ্যাশনের ইতিহাসে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'ওয়াচ পকেট' (Watch Pocket) নামেই অভিহিত করা হত। Getty Images

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের অভ্যাসেও বড় বদল এসেছে এবং উনবিংশ শতাব্দীর পকেট ঘড়ির জায়গা দখল করে নিয়েছে আধুনিক হাতের ঘড়ি ও ডিজিটাল ওয়াচ। সময়ের নিয়মে পকেট ঘড়ির ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেলেও জিন্সের নকশা থেকে কিন্তু এই 'ওয়াচ পকেট' বাদ পড়েনি। ফ্যাশন ডিজাইনারদের মতে, এটি এখন জিন্সের ক্লাসিক ও আইকনিক ভিজ্যুয়াল ডিজাইনের এক অন্যতম অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। Getty Images

পকেট ঘড়ির চল উঠলেও আজকের দিনে এই ক্ষুদ্র পকেটটি কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়, বরং এটি নানাবিধ ছোটখাটো দরকারী কাজে ব্যবহৃত হয়। দৈনন্দিন জীবনে হঠাৎ প্রয়োজন হওয়া খুচরো কয়েন কিংবা বাস-ট্রেনের টিকিট রাখার জন্য এই পকেটটির তুলনা হয় না। আকারে ছোট ও বেশ আঁটসাঁট হওয়ার কারণে এখান থেকে কয়েন বা কাগজ গলে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার কোনও ভয় থাকে না। Getty Images

ডিজিটাল যুগে মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে নানা ধরণের টেকনোলজি আর তার সাথে বদলেছে এই ছোট পকেটের ব্যবহারের ধরণও। বর্তমানে অনেকেই পেনড্রাইভ, মেমোরি কার্ড কিংবা ওয়্যারলেস ইয়ারবাডসের মতো দামি প্রযুক্তিগত ছোট ছোট জিনিস নিরাপদ রাখতে এটি ব্যবহার করেন। এটি এতটাই টাইট যে হাঁটাচলা কিংবা দৌড়াদৌড়ি করলেও এই দরকারি জিনিসগুলো পকেটের ভেতরে একদম সুরক্ষিত থাকে। Getty Images

শুধু কয়েন বা গ্যাজেটই নয়, জরুরি মুহূর্তে কাজে লাগার মতো ছোট লাইটার, প্রয়োজনীয় ওষুধের স্ট্রিপ কিংবা চাবি রাখার জন্যও এটি একটি দারুণ জায়গা। বিশেষ করে রিং ছাড়া একটিমাত্র একক চাবি প্যান্টের বড় পকেটে রাখলে তা খুঁজে পেতে সমস্যা হয়, কিন্তু এই মিনি পকেটে রাখলে চোখের নিমেষেই তা হাতড়ে বের করে নেওয়া যায়। আবার অনেক ফ্যাশনপ্রেমী মানুষ এতে আঙুলের আংটিও সাময়িকভাবে খুলে নিরাপদে রেখে দেন। Getty Images

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী এটি জিন্সের কেবল একটি সাধারণ পকেট নয়, বরং জিন্সের পাঁচটি মূল পকেটের মধ্যে একটি (Fifth Pocket)। ১৮৭৩ সালের অফিশিয়াল ডিজাইনে সামনে দুটি বড় পকেট, পেছনে একটি পকেট এবং এই ছোট ওয়াচ পকেটসহ মোট চারটি পকেট ছিল, যা পরবর্তীতে পাঁচটি হয়। তাই পরের বার যখন জিন্স পরবেন, মনে রাখবেন পকেটের এই ছোট্ট অংশটি কেবল স্টাইল নয়, বয়ে চলেছে দেড়শো বছরের ঐতিহ্যের এক দারুণ নিদর্শন। Getty Images