
রথযাত্রা মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তিন ভাই-বোনের মাসির বাড়ি যাওয়া কে কেন্দ্র করে জাঁকজমক, লাখো ভক্তের ভিড়। কিন্তু এই উৎসবের আড়ালে যে এক মিষ্টি দাম্পত্য কলহ আর অভিমানের গল্প লুকিয়ে আছে, তা হয়তো অনেকেই জানেন না। সারা বছর যে স্ত্রী স্বামীকে আগলে রাখলেন, স্বামী যদি তাঁকে না জানিয়েই দাদা আর বোনকে নিয়ে ঘুরতে চলে যান, তবে তো ঘরের গৃহিণীর রাগ হওয়া খুব স্বাভাবিক! এক সাক্ষাৎকারে খোদ পুরী মন্দিরের রত্নবেদীর সেবাইত বিজয় কৃষ্ণ সিংহালী শুনিয়েছেন ভগবান জগন্নাথ দেব ও দেবী মহালক্ষ্মীর সংসারের সেই ঘরোয়া কাহিনী।
সেবাইত জানান, এই মান-অভিমানের গল্পটা শুরু হয় আষাঢ়ের শুক্ল দ্বিতীয়ায়। দেবী মহালক্ষ্মীকে কিছু না বলেই জগন্নাথ দেব বড় ভাই বলভদ্র আর বোন সুভদ্রাকে নিয়ে রথে চেপে মাসির বাড়ি রওনা দেন। এদিকে ঘুম থেকে উঠে স্বামীকে না দেখে মা লক্ষ্মীর মনে তীব্র অভিমান জাগে। রাগে ও ক্ষোভে তিনি জগন্নাথ দেবের মূল মন্দিরের রান্নাঘরের উনুন পর্যন্ত ভেঙে দেন! ঘরের লক্ষ্মী রেগে গেলে যা হয় আর কী! তবে গৃহিণীর এই রাগ কিন্তু এখানেই থামেনা। উৎসবের পঞ্চম দিনে, যাকে বলা হয় ‘হেরাপঞ্চমী’, মা লক্ষ্মী পালকিতে চেপে সোজা হাজির হন মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুণ্ডিচা মন্দিরে।
বিজয়বাবু আরও বলেন, সেখানে গিয়ে যখন দেবী দেখেন যে ভেতরের দরজা বন্ধ এবং প্রভু বাইরের লোক ও ভক্তদের নিয়ে পরমানন্দে মেতে আছেন, তখন তাঁর রাগ যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। অভিমানে ফেটে পড়ে মা লক্ষ্মী বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা জগন্নাথ দেবের রথের একটি চাকা ভেঙে দেন! রাগ কতখানি হলে এমনটা করা যায়, ভাবুন! এরপর তিনি যে চেনা রাস্তা দিয়ে এসেছিলেন, লোকলজ্জার ভয়ে সেই পথ ছেড়ে অন্য এক গোপন গলি দিয়ে চুপচাপ নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন।
উৎসবের একদম শেষে, যখন জগন্নাথ দেব উল্টো রথে চড়ে নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। সিংহদুয়ারের কাছে আসতেই মা লক্ষ্মী রাগ করে সদর দরজা খিল তুলে বন্ধ করে দেন। জগন্নাথ দেব তখন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রীতিমতো অনুনয়-বিনয় শুরু করেন। শেষমেশ বউয়ের মান ভাঙাতে ওড়িশার বিখ্যাত, নরম তুলতুলে রসগোল্লা তাঁর মুখে তুলে দেন প্রভু। মিষ্টির জাদুতে নিমেষেই গলে যায় মা লক্ষ্মীর সব রাগ, মিটে যায় স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াও। সেবাইত বিজয় কৃষ্ণ সিংহালীর মতে, দেব-দেবীর এই ঘরোয়া লীলা আসলে আমাদের সাধারণ মানুষের সংসার সুখের এক বড় শিক্ষা। নিজেদের মধ্যে যতই ভুল বোঝাবুঝি বা ঝগড়া হোক না কেন, বাইরের লোককে না ডেকে তা নিজেদের ঘরের মধ্যেই মিষ্টি মুখে মিটিয়ে নেওয়া উচিত, এই বার্তাই দেয় পুরীর রথযাত্রা।
(তথ্য সৌজন্য: ‘রাইডস অ্যান্ড বাইটস উইথ অনামিকা’ ইউটিউব চ্যানেল)