
জগন্নাথদেব (Lord Jagannath), বলরাম ও সুভদ্রার বিশাল রথ যখন পুরীর বড়দণ্ডে আলো করে দাঁড়ায়, তখন সেই রোমাঞ্চকর দৃশ্যের সাক্ষী হন দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ ভক্ত। রাজকীয় পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে খোদ পুরীর রাজবংশের রাজা রথের সামনে আসেন এবং নিজের হাতে রাস্তা পরিষ্কার করতে শুরু করেন। তবে যে সে ঝাড়ু নয়, তাঁর হাতে থাকে এক মহার্ঘ সোনার ঝাড়ু, যার হাতলে নিখুঁত সোনার শিল্পকর্ম করা থাকে। শতাব্দী প্রাচীন পুরীর রথযাত্রায় এই বিশেষ আচারটি ‘ছেরা পহনরা’ (Chera Pahanra) নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ পরিচ্ছন্নতার কাজ বলে মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক তাৎপর্য, যা এই উৎসবের পবিত্রতাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে।
মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য রুপো, তামা বা অন্য কোনও ধাতুর বদলে কেন কেবল সোনাকেই বেছে নেওয়া হল? আসলে সনাতন ঐতিহ্যে সোনা বা স্বর্ণকে কেবল একটি মূল্যবান ধাতু হিসেবে দেখা হয় না, একে মনে করা হয় পরম পবিত্রতা, শুদ্ধতা এবং সমৃদ্ধির প্রতীক। জগন্নাথদেব হলেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নাথ বা পরমেশ্বর। তাঁর রথের পথকে জাগতিক কোনও সাধারণ বস্তু দিয়ে স্পর্শ করা শাস্ত্রসম্মত বলে মনে করা হয় না। তাই ঈশ্বরের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও ভক্তি জানাতেই এই আচারে খাঁটি সোনা ব্যবহার করা হয়। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে শ্রীক্ষেত্রের এই মহোৎসবে সুগন্ধি চন্দন জল ছেটানোর পর তিন রথের চারপাশ এই সোনার ঝাড়ু দিয়ে সাফ করেন গজপতি মহারাজা।
তবে এই সোনার ঝাঁটার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অহংকারকে চূর্ণ করার দর্শনে। রাজা হলেন রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, বৈভবের প্রতীক। তাঁর হাতে যখন সোনা দেওয়া হয়, তখন তিনি প্রমাণের চেষ্টা করেন যে, জাগতিক সমস্ত বৈভব ও রাজকীয় অহংকার তিনি ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করছেন। সোনা দিয়ে তৈরি ঝাঁটা দিয়ে রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার অন্তর্নিহিত অর্থ হল, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদও ভগবানের দাসত্বের কাছে তুচ্ছ। অন্য কোনও সাধারণ ধাতু ব্যবহার করলে এই গভীর আধ্যাত্মিক বৈপরীত্য এবং রাজকীয় সমর্পণের বার্তাটি হয়তো এত জোরালোভাবে প্রকাশ পেত না। পুরীর রাজাকে জগন্নাথের প্রথম সেবক বা প্রধান সেবক বলে মনে করা হয়। ঈশ্বরের দরবারে রাজা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই, তা প্রমাণ করতেই রাজপরিবারের প্রতিনিধি এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন।
তিন ঠাকুরকে যখন রথে বসিয়ে মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুণ্ডিচা মন্দিরের অভিমুখে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শেষ হয়, তখনই গজপতি মহারাজা তাঁর এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে কয়েক দিন বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার উল্টো রথে ফিরে আসবেন মহাপ্রভু। ধর্মীয় বিশ্বাস বলে, এই রথের রশি টানা যেমন সমস্ত পাপের বিনাশ করে, তেমনই এই পবিত্র আচারটি দর্শন করলেও পুণ্য লাভ হয়।