
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ (Lord Krishna), যাঁর জন্মের রাতে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মাঝেও অলৌকিকভাবে খুলে গিয়েছিল মথুরার বন্দিশালার সব দরজা। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দেশজুড়ে পালিত হয় জন্মাষ্টমী। কংসের কারাগার থেকে সদ্যোজাত শিশুকে কীভাবে যমুনা পার করে গোকুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা অনেকেই জানেন। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই একরত্তি শিশুর নাম ‘কৃষ্ণ’ কে রেখেছিলেন? কেনই বা দেওয়া হয় এমন নাম? এর পেছনে রয়েছে এক দারুণ গল্প।
ঘটনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল কংসের তীব্র আতঙ্কে। দৈববাণী অনুযায়ী দেবকীর অষ্টম সন্তানই কংসের কাল হবে। তাই যশোদা আর নন্দরাজার ঘরে বড় হতে থাকা শিশুটির খবর যাতে কোনওভাবেই মথুরা পর্যন্ত না পৌঁছায়, সেদিকে ছিল কড়া নজর।
সাধারণত পরিবারে নতুন সন্তানের আগমনে মহাসমারোহে সবাইকে ডেকে নামকরণের রীতি রয়েছে। কিন্তু নন্দরাজার সামনে তখন বিরাট বিপদ। সামান্য ভুলেও যদি কংসের চরেরা টের পেয়ে যায়, তবে গোটা গোকুল ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই উৎসবের সমস্ত আয়োজন বাতিল করে সবকিছু একেবারে গোপনে সারার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।
উপায় খুঁজতে নন্দ নিঃশব্দে বার্তা পাঠালেন যদুবংশের পরম পণ্ডিত ও কুলগুরু মহর্ষি গর্গ বা গর্গাচার্যের কাছে। গর্গাচার্যও ছিলেন অসম্ভব দূরদর্শী। তিনি জানতেন, তাঁর মতো এক নামজাদা রাজপুরোহিত যদি হঠাৎ গোকুলে আসেন, তবে কংসের চরদের সন্দেহ হতে বিন্দুমাত্র সময় লাগবে না। তাই দিনের আলো এড়িয়ে, ছদ্মবেশে এক নিঝুম রাতে তিনি এসে পৌঁছন নন্দরাজার বাড়িতে।
কোনও উৎসব নয়, কোনও ঢাক-ঢোলের আওয়াজ নয়, গোশালার পেছনের এক অন্ধকার ঘরে টিমটিমে প্রদীপের আলোয় বসে নামকরণের গোপন আসর।
প্রথমে রোহিণীর কোল থেকে শিশুটিকে মহর্ষির সামনে আনা হল। তার শান্ত, সৌম্য ও আনন্দদায়ক রূপ দেখে মহর্ষি বললেন, “এই বালক তার স্বভাবগুণে সবাইকে আনন্দ দেবে, তাই এর নাম হবে ‘রাম’। আর ভবিষ্যতে তার অপার শারীরিক ক্ষমতার কারণে লোকে তাকে ডাকবে ‘বলরাম’ নামে।”
এর পরেই যশোদার কোলে থাকা শ্যামবর্ণের শিশুটির দিকে নজর গেল মহর্ষির। একপলক দেখেই ঋষি বুঝতে পারলেন, এ কোনও সাধারণ মানবশিশু নয়। নন্দবাবাকে ডেকে গর্গাচার্য মৃদু স্বরে বললেন, “নন্দ, এই বালক যুগে যুগে বিভিন্ন রঙ ও রূপে ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছে। এবার সে এসেছে বর্ষার মেঘের মতো স্নিগ্ধ শ্যামল বর্ণ নিয়ে। তাই এর নাম হবে ‘কৃষ্ণ’।”
সংস্কৃতে ‘কৃষ্ণ’ শব্দের অর্থ যেমন শ্যামবর্ণ বা কালো, তেমনই এর গভীর অর্থ হল ‘সর্বাকর্ষক’, অর্থাৎ যিনি নিজের অপার ভালোবাসায় সবাইকে কাছে টেনে নেন। ঋষি গর্গাচার্য সেদিনই নন্দবাবাকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছিলেন, এই বালক বড় হয়ে অসাধ্য সাধন করবে এবং মানুষকে সমস্ত বিপদ থেকে উদ্ধার করবে।
সেই নিঝুম রাতের ছোট্ট আয়োজন থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন শ্রীকৃষ্ণ। আর গোকুলবাসীর ভালোবাসায় বাঁধা পড়ে সেই কৃষ্ণই পরবর্তীকালে পরিচিত হলেন কানহা, গোপাল কিংবা মাখনচোর নামে।