
গণেশ চতুর্থীর দিন সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ দেখতে নেই। ছোটবেলা থেকে ঠাকুমা-দিদিমাদের মুখে এই বারণ অনেকেই শুনেছেন। ভুল করে আকাশের দিকে চোখ চলে গেলে মনে একটা অজানা ভয় কাজ করত, এই বুঝি জীবনে কোনও অমঙ্গল নেমে এল! উৎসবের আনন্দের মাঝেও কেন এই বিশেষ দিনে চাঁদ মামাকে নিয়ে এত ভীতি? কেনই বা এই দিনটি ‘কলঙ্ক চতুর্থী’ নামে পরিচিত? এর নেপথ্যে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন এক পৌরাণিক কাহিনি।
‘কলঙ্ক চতুর্থী’ কেন বলে?
পুরাণ অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের এই চতুর্থী তিথিটি ‘কলঙ্ক চতুর্থী’ বা ‘নষ্টচন্দ্র’ নামে সমধিক পরিচিত। প্রচলিত লোককথা থেকে জানা যায়, একবার বিঘ্নহর্তা গণেশের গজানন রূপ এবং ভারী পেট দেখে অহংকারী চন্দ্রদেব চরম উপহাস করে বসেন। নিজের রূপের গরবে অন্ধ চাঁদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। চন্দ্রের এমন দাম্ভিক আচরণে বেজায় ক্ষুব্ধ হন গণেশ ঠাকুর। তিনি রেগে গিয়ে চন্দ্রকে অভিশাপ দেন যে, যাঁর নিজের রূপ নিয়ে এত অহংকার, তাঁর সেই রূপ চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে এবং কেউ তাঁর দিকে ফিরেও তাকাবে না।
গণেশের ক্রোধ এখানেই শান্ত হয়নি। তিনি আরও বলেন, ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের এই চতুর্থী তিথিতে যে ব্যক্তি চাঁদের দিকে তাকাবে, তাঁকে বিনা দোষে মিথ্যা কলঙ্কের ভাগী হতে হবে। সমাজে তার ভাবমূর্তি চরম ভাবে নষ্ট হবে। এই ভয়ংকর অভিশাপের ফলেই চন্দ্রের দীপ্তি বা জ্যোতি দিন প্রতিদিন কমতে শুরু করে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে চন্দ্রদেব তখন অনুতপ্ত হন। গণেশের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার পাশাপাশি তিনি দেবাদিদেব মহাদেব শিবের কঠোর আরাধনা শুরু করেন।
শিব তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে নিজের মস্তকে ধারণ করে রক্ষা করেন। এরপর শিবের পরামর্শেই চন্দ্র ফের গণেশের আরাধনা করেন। চন্দ্রের একনিষ্ঠ প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে গণেশ জানান, তাঁর দেওয়া অভিশাপ সম্পূর্ণ রূপে বাতিল করা সম্ভব নয়, তবে এর প্রভাব কিছুটা কমানো যেতে পারে। গণেশের বরে এরপর থেকেই ১৫ দিন চন্দ্রের ক্ষয় হয় এবং পরের ১৫ দিন তিনি পূর্ণ রূপ লাভ করেন। তবে, ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে চন্দ্র দর্শনের অভিশাপ কিন্তু আগের মতোই বজায় থাকে।
এমনকী বিষ্ণু পুরাণেও এই অভিশাপের এক আশ্চর্য উল্লেখ রয়েছে। শোনা যায়, এই কলঙ্ক চতুর্থীর দিনে চন্দ্র দর্শন করার কারণে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকেও মিথ্যা অপবাদের শিকার হতে হয়েছিল। স্যমন্তক মণি চুরির মতো ভয়ঙ্কর মিথ্যা কলঙ্ক সইতে হয়েছিল স্বয়ং ভগবানকেও! সেই ঘটনা থেকেই এই দিনটিকে কলঙ্ক চতুর্থী হিসেবে পালন করার প্রথা শুরু হয়।
তাই আজও বহু মানুষ এই বিশেষ দিনটিতে যথেষ্ট সাবধানে থাকেন। সূর্যাস্তের পর অকারণে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটাচলা থেকে সচেতন ভাবেই বিরত থাকেন অনেকেই। বিশ্বাস বা অবিশ্বাস সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রোমাঞ্চকর লোককথা আজও মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।