
কলকাতা: ফুটবল ময়দানে বিভিন্ন রকম চরিত্রের খোঁজ মেলে। এক একজন ফুটবলারের এক এক রকম বৈশিষ্ট্য। এক একজনের প্লেইং স্টাইল এক এক রকমের। ফুটবল ময়দানে আবার বিভিন্ন রকম দর্শকের খোঁজও মেলে। যারা প্রিয় দলের জন্য পাগল। অফিস কেটে, কলেজ ছুটির পর বা কেউ নিজের কাজ ফেলে মাঠে ভিড় জমান। অনেকে প্রেমিকার হাত ছেড়ে ময়দানে আসেন। প্রিয় দলের খেলা দেখতে। প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটাতে। বিপক্ষের জালে যখন বল জড়ায় তখন গ্যালারির সবাই সমস্বরে চিৎকার করে বলে, ‘গোওওওওওওওল’। কৈশোরে পা রাখা যুবক তখন ষাটোর্ধ্ব সিনিয়র সিটিজেনের সঙ্গে কোলাকুলি করে। পাশে বসে থাকা তরুণের জার্সি টেনে তাকে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘদিনের প্রিয় বান্ধবী। ওই একটা গোল যেন একসুরে বেঁধে দেয় সবাইকে। টেনশনের চোরাস্রোত কাটিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ধরা দেয় গ্যালারিতে। এরকম অনেক টুকরো ছবি ভেসে ওঠে ফুটবল ময়দানে। তবে সেই গ্যালারিতেই এমন কেউ কেউ বিকল্প থেকে যান, যাঁরা শুধু খেলার শব্দ শুনতে মাঠে আসেন! বিস্তারিত জেনে নিন TV9Bangla Sports-এর এই প্রতিবেদনে।
নাম প্রদীপ দাস। বাড়ি হাওড়া সালকিয়ায়। জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। তবু তাঁর কাছে ইস্টবেঙ্গল মানে আবেগ। আর ওই লাল-হলুদ জার্সি তাঁর ভালোবাসা। শব্দ শুনে ফুটবলকে ভালোবেসেছেন। মনের মধ্যেই ফুটবল ক্যানভাস এঁকেছেন। যেখানে বল নিয়ে ছুটে যান অ্যালভিটো ডি’কুনহা। থ্রু বাড়ান বাইচুংকে। পাহাড়ি ঝর্ণা গোল করে দোলা দেন প্রদীপ দাসের মনে। আবার কখনও দলের কঠিন মুহূর্তে হাল ধরেন ডগলাস দ্য সিলভা। রক্ষণ জমাট করেন স্যামি ওমোলো। এঁদেরকেই মনের মধ্যে উপলব্ধি করেন প্রদীপ। জন্মসূত্রে বাঙাল হওয়ায় ইস্টবেঙ্গলই তাঁর ধ্যান জ্ঞান। পড়াশোনা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে। ক্লাস সেভেনের অর্থাভাবে আর এগোতে পারেননি। সেই প্রদীপ দাসকে নিয়ে তৈরি হল বিশেষ তথ্যচিত্র। পরিচালক শুভ্র মুখোপাধ্যায়। ‘খেলার শব্দ শুনতে মাঠে আসা’ এই কথাটাই নাড়িয়ে দেয় পরিচালককে। কর্মজীবনে সাংবাদিক ছিলেন। তাই প্রদীপ দাসকে নিয়ে তথ্যচিত্র করার পরিকল্পনা তখনই মাথায় আসে পরিচালকের।
প্রদীপের কথায়, ‘১৯৯৭ সালে ফেডারেশন কাপে ইস্টবেঙ্গল বনাম এয়ার ইন্ডিয়া ম্যাচ দেখতে প্রথমবার মাঠে আসি। সেই থেকে কলকাতায় ম্যাচ থাকলেই ছুটে আসি। সালকিয়া থেকে বাসে করে নামি আকাশবাণী ভবন। ওখান থেকে কেউ রাস্তা পার করিয়ে দেয়। তারপর চলে আসি ইস্টবেঙ্গল মাঠে। রোদ, জল উপেক্ষা করেই মাঠে আসা। সঙ্গী আমার এই লাঠি। যুবভারতীতেও খেলা দেখতে যাই। ইচ্ছে আছে ভুবনেশ্বরে ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে যাওয়া। ২০১৯ সাল পর্যন্ত একাই আসতাম। এখন ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল স্কুলে অনুশীলনরত দুই ছাত্রের হাত ধরে মাঠে আসি। সৌম্যজিৎ মল্লিক আর স্নেহাশিস দত্ত দুই ছাত্রের নামে সালকিয়াতে একটি কোচিং ক্যাম্পও তৈরি করেছি। ফুটবলের নেশায় এই কোচিং ক্যাম্প শুরু। ২০১৯ সালে কোচিং ক্যাম্পের কোচ মন্টু অধিকারী মারা যান। এখন ছেলেরা নিজেরাই প্র্যাকটিস করে। ‘
চোখে দেখতে না পেয়েও মাঠে আসার অদম্য জেদ। কেন? প্রদীপের উত্তর, ‘আমার কান চোখের কাজ করে। কানে শুনে ধরে নিতে পারি কোন দল খারাপ খেলছে আর কোন দল ভালো খেলছে। গ্যালারির শব্দই আমাকে সব বুঝিয়ে দেয়।’ ইস্টবেঙ্গল বাইরে খেলতে গেলে টিভির কমেন্ট্রি শুনেই প্রিয় দলের খেলা উপভোগ করেন প্রদীপ দাস।
বাড়িতে থাকেন এক ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, দুই ছেলে আর মা। আর এক ভাই আর বোন পরিবার নিয়ে আলাদা থাকেন। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব শতবর্ষের অনুষ্ঠানে প্রদীপ দাসকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে সাহায্য করে। এ ছাড়া লাল-হলুদের সব ম্যাচের টিকিটই পেয়ে যান তিনি।
তথ্যচিত্র মুক্তি পাচ্ছে কবে? পরিচালক শুভ্র মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এখনই আমরা ইউটিউবে এটা ছাড়ছি না। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে পাঠাব। এ ছাড়া বিদেশের ফুটবল ফেডারেশনের কাছেও পাঠাব। ইচ্ছে আছে বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তথ্যচিত্রটি পাঠানোর। অনেক স্পোর্টস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালও হয়। পরবর্তীতে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকেও দেব এই তথ্যচিত্র।’