
ওন্দা: বাঁকুড়ার সবচেয়ে বড় গ্রাম ওন্দা ব্লকের পুনিশোল। সংখ্যালঘু প্রধান এই গ্রামে সবমিলিয়ে বাস ৬০-৭০ হাজার মানুষের। অশিক্ষা আর অভাবে আপাদমস্তক ডুবে থাকা এই গ্রামকে বলা হত বাঁকুড়ার চম্বল। গ্রামের পরিচয় দিতে সাহস পেতেন না গ্রামবাসীরা। সেই গ্রামই এখন ফিরছে আলোয়। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে এবার নিট পরীক্ষায় (NEET Examination) উত্তীর্ণ হয়ে মেডিক্যাল পড়ার সুযোগ পেলেন গ্রামের পড়ুয়া কালিমুল্লা মণ্ডল।
পুনিশোল গ্রাম একসময় ডুবে ছিল অশিক্ষার অন্ধকারে। অধিকাংশ পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। অধিকাংশ মানুষের নিজস্ব কৃষিজমি বলতে কিছুই নেই। আজও গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবন জীবিকা নির্বাহ হয় হকারি করে অথবা ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। একসময় গ্রামের কিছু মানুষ যুক্ত হয়ে পড়েন বিভিন্ন দুষ্কর্মে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইকে নিজেদের পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। আর হাতে গোনা সেই কয়েকজনের জন্য গ্রামের নামের সঙ্গে জড়িয়ে নানা অপবাদ। গ্রামের নামটা বলতেও একসময় লজ্জাবোধ করতেন গ্রামবাসীরা।
গত কয়েক দশক ধরে অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই গ্রামই এখন ফিরছে আলোর পথে। গ্রামবাসীদের অর্থনৈতিক অবস্থার তেমন বদল না হলেও ধীরে ধীরে শিক্ষার আলোয় ফিরছে গ্রামের কচিকাঁচারা। ৬০ থেকে ৭০ হাজার বাসিন্দার এই গ্রামে এবার প্রথম নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল কোনও পড়ুয়া। সর্বভারতীয় র্যাঙ্কিংয়ে ৫ লক্ষ ৮৪ হাজার ও রাজ্যের স্টেট র্যাঙ্কিংয়ে ৮ হাজার র্যাঙ্ক করে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেলেন গ্রামের কালিমুল্লা মণ্ডল। ছোট থেকেই শারীরিকভাবে ৬০ শতাংশ বিশেষভাবে সক্ষম কালিমুল্লা ২০২৩ সালে পুনিশোল বোর্ড হাইস্কুল থেকে ৬৪৬ নম্বর এবং ২০২৫ সালে বাঁকুড়া বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে ৪৪০ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন।
উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় থেকে নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন কালিমুল্লা। প্রাক্তন সরকারি কর্মী বুয়ালি কলন্দর মণ্ডলের নবম সন্তান কালিমুল্লার এমন সাফল্যে এখন খুশির হাওয়া পুনিশোলজুড়ে। পুনিশোল গ্রামকে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরানোর ক্ষেত্রে আগামিদিনে কালিমুল্লাদের সাফল্যই হয়ে উঠবে আলোকবর্তিকা, দাবি কালিমুল্লার প্রাক্তন শিক্ষকদের।
কী বললেন কালিমুল্লার প্রাক্তন শিক্ষক?
পুনিশোল বোর্ড হাইস্কুলের সহশিক্ষক বিবেকরঞ্জন মাজি বলেন, “আমাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র কালিমুল্লা। ২০২৩ সালে আমাদের বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছিল। আমাদের স্কুলের এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে সে। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানাই। পুনিশোল গ্রামে একটা ইতিহাস রচনা হল। পুনিশোল বললেই একটা অন্ধকার জগতের কথা সবার মাথায় আসে। কালিমুল্লার সাফল্যে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পুনিশোল আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এখন যেসব ছেলে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখছে, কালিমুল্লার সাফল্য তাদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।”
কী বলছেন কালিমুল্লার বাবা?
ছেলের এই সাফল্যে খুশি কালিমুল্লার বাবা-মা। বুয়ালি কলন্দর মণ্ডল বলেন, “আমি অত্যন্ত খুশি। পুনিশোলে অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে রয়েছে। কিন্তু, গাইডের অভাব। ঠিকমতো কোচিং পায় না। সেইজন্য পিছিয়ে রয়েছে।” ছেলে গ্রামের মুখ আরও উজ্জ্বল করবে বলে আশাবাদী তিনি। আবু বক্কর খানা নামে এক প্রতিবেশী বলেন, “পুনিশোলের পরিচয় দিতে অস্বস্তিতে পড়তে হত। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদল হয়েছে।”
কী বলছেন কালিমুল্লা?
লাজুক। কম কথা বলেন। নিজের সাফল্য নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত হতে চান না কালিমুল্লা। বললেন, “অনলাইনে ক্লাস করতাম। প্রতিবন্ধকতা আমার ক্ষেত্রে বাধা হয়নি। বরং আমাকে মোটিভেট করেছে।” পুনিশোলে শিক্ষার অভাব নিয়ে তাঁর বক্তব্য, “পুনিশোলের খারাপ দিকটাই মানুষ জেনেছে। আরও অনেক ভালো দিক রয়েছে। কিন্তু, মানুষ জানতে পারেনি। গ্রামে শিক্ষার অভাব রয়েছে।” স্কুলের পড়ুয়াদের তাঁর বার্তা, “লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে। লক্ষ্য থেকে বিচ্যুৎ হওয়া চলবে না। আর সৎভাবে পরিশ্রম করতে হবে।”