
কলকাতা : বেহালার বাসিন্দা অজয় পাল। চাকরি করেন সল্টলেক সেক্টর ফাইভে। সকাল ১১টায় অফিস। প্রতিদিন বাড়ি থেকে বেরোতে হয় সাড়ে ৮টা নাগাদ। অফিসে পৌঁছতেই তো দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লেগে যায়। অটো, মেট্রো, বাস…একাধিক যানবাহন পাল্টে যেতে হয় অফিসে। আর তা না হলে নির্ভর করতে হয় শাটলের উপর। কিন্তু তাতেও তো প্রচুর খরচ। সকলের পক্ষে রোজ এই খরচ করা সম্ভব নয়। গত কয়েক বছর ধরে এইভাবেই যাতায়াত করতে হচ্ছে তাঁকে। অথচ তারও আগে ছবিটা আলাদা ছিল। বেহালা থেকে সেক্টর ফাইভ যাওয়ার জন্য একাধিক সরকারি বাস ছিল রাস্তায়। কিন্তু, এখন তা ‘ডুমুরের ফুল’। সরকারি বাসগুলি তুলে নেওয়া হয়েছে। বেহালা-সেক্টর ফাইভের মতোই সরকারি বাসের বিভিন্ন রুট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আর বাসের এই বেহাল দশার চিত্রটা কিন্তু সবথেকে বেশি উঠে এসেছে তৃণমূল সরকারের আমলে। এমনই অভিযোগ উঠেছে বারবার।
ছবিটা অবশ্য পুরো ১৫ বছরের নয়। ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। তারও সাত-আট বছর পর থেকে রাজ্যে পরিবহন ব্যবস্থার ছবিটা বদলাতে শুরু করে। সরকারি বাসের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। অটো, টোটোর দৌরাত্ম্য বাড়তে শুরু করে। খোদ পরিবহন দফতরের তথ্য বলছে, গত ৭-৮ বছরে শহর থেকে শহরতলিতে প্রায় ১০০টির বেশি পরিচিতি সরকারি বাস রুট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পরিবহন দফতরের তথ্য বলছে, বছরখানেক আগেও রাজ্যজুড়ে দৈনিক গড়ে ২,৫০০টি সরকারি বাস চলত। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে দৈনিক গড়ে ৭০০টি। শুধু কলকাতাতেই সরকারি বাসের সংখ্যা ২২৭০। এরপর ক্রমশ কমতে কমতে সেই সংখ্যা কোথায় পৌঁছবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবহন দফতরের কর্মীরাই।
সিএসটিসি পরিচালিত সরকারি বাস রুট
১) AC9A: গল্ফগ্রিন থেকে দক্ষিণেশ্বর
২) AC10: নীলগঞ্জ থেকে হাওড়া স্টেশন
৩) AC15: বানতলা আইটি পার্ক থেকে হাওড়া স্টেশন
৪) AC16: টালিগঞ্জ থেকে জনকল্যাণ
৫) AC17: হরিদেবপুর থেকে সল্টলেক
৬) AC17B: কুঁদঘাট থেকে ডানলপ
৭) AC25: ডানলপ থেকে সল্টলেক
৮) AC34: আড়িয়াদহ থেকে হাওড়া স্টেশন
৯) AC35: মিল্ক কলোনি থেকে সাপুরজি
১০) AC37B: গড়িয়া থেকে এয়ারপোর্ট (সন্তোষপুর হয়ে)
১১) AC41: সাঁতরাগাছি থেকে ইকোস্পেস
১২) AC42: সাঁতরাগাছি থেকে ঠাকুরপুকুর
১৩) AC44: নবান্ন থেকে নিউটাউন
১৪) AC47: কুঁদঘাট থেকে শাপুরজি
১৫) AC48: কুঁদঘাট থেকে বানতলা আইটি পার্ক
১৬) AC49A: বেহালা ১৪ নম্বর থেকে এয়ারপোর্ট
১৭) AC49B: এসপ্ল্যানেড থেকে এয়ারপোর্ট (শিয়ালদহ হয়ে)
১৮) AC50: গড়িয়া থেকে বেলুড়মঠ
১৯) AC51: কুঁদঘাট থেকে এয়ারপোর্ট
২০) AC53: সাঁতরাগাছি থেকে পাটুলি
ডব্লুবিএসটিসি পরিচালিত যে সরকারি বাস রুট বন্ধ হয়ে গিয়েছে
১) V2: সাঁতরাগাছি থেকে এয়ারপোর্ট
২) V9: টালিগঞ্জ থেকে নিউটাউন
৩) VS3: এয়ারপোর্ট থেকে বেহালা পর্ণশ্রী
৪) VS4: বেহালা পর্ণশ্রী থেকে ইকো স্পেস
৫) VS12: সাঁতরাগাছি থেকে নিউটাউন
৬) VS13: গড়িয়া থেকে বানতলা আইটি পার্ক
বিদ্যুৎ চালিত সরকারি বাস রুট
১) EB1A: সাঁতরাগাছি থেকে ডানলপ
২) EB2: বালিগঞ্জ থেকে জোকা
৩) EB2A: টালিগঞ্জ থেকে করুণাময়ী
৪) EB4: গড়িয়া থেকে বি গার্ডেন
৫) EB6: নবান্ন থেকে ধাড়সা
৬) ACT1: সাঁতরাগাছি থেকে এসপ্ল্যানেড
৭) ACT2: করুণাময়ী থেকে রাজচন্দ্রপুর
৮) ACT3: সাঁতরাগাছি থেকে বারাসত
৯) MW1: সুলেখা থেকে ইউনিটেক
১০) MW2: নিউটাউন থেকে হাওড়া
১১) MW7: বানতলা আইটি পার্ক থেকে এয়ারপোর্ট
সিএসটিসি পরিচালিত বন্ধ নন এসি সরকারি বাস
১) S2A: পাইকপাড়া থেকে পাটুলি
২) S2B: বাগবাজার থেকে কালিকাপুর
৩) S4B: হরিদেবপুর থেকে নিউটাউন
৪) S6A: গড়িয়া স্টেশন থেকে হাওড়া স্টেশন
৫) S12C: পাইকপাড়া থেকে নয়াবাদ
৬) S14D: গড়িয়া বাস স্ট্যান্ড থেকে সল্টলেক জিডি ব্লক
৭) S15: উল্টোডাঙা থেকে হাওড়া স্টেশন
৮) S15G: বারুইপুর থেকে দক্ষিণেশ্বর
৯) S19: যাদবপুর থেকে উল্টোডাঙা
১০) S22A: ডাকঘর থেকে করুণাময়ী
১১) S23: হাওড়া স্টেশন থেকে করুণাময়ী
১২) S30D: দমদম পার্ক থেকে দমদম পার্ক
১৩) S34A: আড়িয়াদহ থেকে হাওড়া স্টেশন
১৪) S37A: গড়িয়া থেকে এয়ারপোর্ট
১৫) S39: এসপ্ল্যানেড থেকে সাঁতরাগাছি
১৬) S39A: শিয়ালদহ থেকে সাঁতরাগাছি
১৭) S42: সাঁতরাগাছি থেকে ঠাকুরপুকুর
১৮) S44: নবান্ন থেকে ইকোস্পেস
১৯) S48: বেহালা থেকে এয়ারপোর্ট
২০) S51: ইডেন সিটি থেকে গড়িয়া
২১) S53: ইউনিটেক থেকে কলকাতা স্টেশন
২২) S55: ঠাকুরপুকুর থেকে বারুইপুর
২৩) S56: কলকাতা স্টেশন থেকে রামনগর
২৪) S59: করুণাময়ী থেকে হাওড়া স্টেশন
২৫) S60: চেতলা থেকে করুণাময়ী
২৬) MIDI2
২৭) M7D: কাঁকুড়গাছি থেকে সোনামুখী বাজার
২৮) M7E: বাগপোতা থেকে হাওড়া স্টেশন
২৯) M15A: ঢাকুরিয়া থেকে বেহালা ১৪ নম্বর
৩০) M16: টালিগঞ্জ থেকে জনকল্যাণ
৩১) M16A: ঠাকুরপুকুর থেকে টালিগঞ্জ মেট্রো
৩২) M18: টালিগঞ্জ থেকে জনকল্যাণ (রাজা রামমোহন রায় রোড হয়ে)
৩৩) MX সিরিজ সম্পূর্ণ বন্ধ।
এর মধ্যে রয়েছে—
MX1: ক্যানাল ওয়েস্ট রোড থেকে করুণাময়ী
MX2: ক্যানাল ওয়েস্ট রোড থেকে নবান্ন
MX3: কলকাতা স্টেশন থেকে এয়ারপোর্ট
সিটিসি পরিচালিত বন্ধ সরকারি বাসগুলি হল
১) C11/1: মুন্সিরহাট থেকে হাওড়া স্টেশন
২) C11/2: ডোমজুড় থেকে নিউটাউন
৩) C20: সাঁতরাগাছি থেকে এসপ্ল্যানেড
৪) C30: সাঁকরাইল থেকে রাজাবাজার
৫) C31: ভাট্টানগর থেকে করুণাময়ী
৬) C33: মাখলা (উত্তরপাড়া) থেকে পার্ক সার্কাস
৭) C36: চাঁদমারি পোল থেকে রাজাবাজার
৮) C41: টালিগঞ্জ থেকে বিরাটি
৯) C43: গড়িয়া থেকে হাবরা
১০) C44: আচিপুর থেকে হাওড়া
১১) C45: ঘোলা থেকে হাওড়া স্টেশন
১২) C46: বারুইপুর থেকে নবান্ন
১৩) C47: সাঁতরাগাছি থেকে গড়িয়া স্টেশন
১৪) C48: দক্ষিণেশ্বর থেকে বারুইপুর
১৫) C49: বারুইপুর থেকে নবান্ন
১৬) C50: শ্যামনগর থেকে হাওড়া স্টেশন
১৭) C51: নৈহাটি থেকে নবান্ন
১৮) T1: ধুলাগড় থেকে রাজাবাজার
এছাড়াও T4, T5, T6 ও T7 দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ।
১৯) D2: হাবরা থেকে নৈহাটি
২০) D3: চুঁচুড়া থেকে করুণাময়ী
২১) D4: শ্রীরামপুর থেকে করুণাময়ী
২২) D4/1: শ্রীরামপুর থেকে বেলগাছিয়া
২৩) D5: উত্তরপাড়া থেকে করুণাময়ী
২৪) D5/1: বালিহল্ট থেকে করুণাময়ী
২৫) D6: নবান্ন থেকে বালিখাল
২৬) D6/1: বালিখাল থেকে বি গার্ডেন
২৭) D12: ডানকুনি থেকে করুণাময়ী
২৮) D15: রামরাজাতলা থেকে হাওড়া স্টেশন
২৯) D16: সালাপ থেকে নিউটাউন
৩০) D17: সালাপ থেকে গড়িয়া
৩১) D27: নৈহাটি থেকে যাদবপুর
৩২) D33: চন্দননগর থেকে এসপ্ল্যানেড
শুধু সরকারি নয়, একাধিক বেসরকারি বাসের রুটও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তার পিছনেও তৃণমূল সরকারকেই দায়ি করা হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, মাস ছয়েক আগে কলকাতায় বেসরকারি বাসের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৩০০ থেকে ৭হাজার ৫০০। বর্তমানে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩০০-র কাছাকাছি। বেসরকারি বাস সংগঠনগুলি বলছে, গত ছয় মাসে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে ২৫ শতাংশ বাস বসে গিয়েছে। প্রধান রুট ছাড়া ভায়া বা অলিগলির ভিতর দিয়ে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আরও বেসরকারি বাস বসিয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিচ্ছে বেসরকারি বাস সংগঠনগুলি।
২০১৮ সালের পর থেকে বেসরকারি বাসের ভাড়া বাড়ায়নি বাস সংগঠনগুলো। কিন্তু, তারপরেও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে। বেসরকারি বাস সংগঠনগুলি নিজেদের মতোই ভাড়া বাড়িয়েছে। কিন্তু তারপরেও ডিজ়েলের দাম বেড়েছে। ডিজ়েলের দাম বেড়েছে। লকডাউনের আগে ডিজ়েলের লিটার পিছু মূল্য ছিল ৬৪ টাকা ৯২ পয়সা। এখন হয়েছে লিটার পিছু ৯২ টাকা ২২ পয়সা। কিন্তু ভাড়া একই রয়ে গিয়েছে। এই নিয়ে বারবার রাজ্য সরকারের তরফে বৈঠকে বসলেও সমাধান মেলেনি। প্রতিবাদ করেও কোনও লাভ হয়নি। ভাড়া বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও ভাড়া বাড়ানো হয়নি বলে অভিযোগ। কয়েকদিন আগেও বেসরকারি বাস সংগঠনগুলো দাবি তুলেছিল, ভাড়া বৃদ্ধি না করলে গণপরিবহন সচল রাখা সম্ভব নয়।
বেসরকারি বাস সংগঠনের তরফে টিটো সাহা জানিয়েছেন, জ্বালানি দাম লাফিয়ে বেড়েছে। কিন্তু, দাম অনুযায়ী ভাড়া পাওয়া যায়নি। রাস্তায় পুলিশ কেস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, যান শাসনে তাঁদের কোনও আপত্তি নেই। জরিমানার বহরটা এত বেড়ে গেল যে রাজস্ব আয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই চাপটা নিয়ে ভাড়া এত কম রেখে চালানো যাচ্ছে না। তৎকালীন তৃণমূল সরকারের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। কিন্তু, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভাড়া বাড়াতে রাজি হননি বলে অভিযোগ। এর ফলে এই ব্যবসায় সেভাবে কেউ আসছে না। গাড়ি কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন অনেকে। কর্মসংস্থান কমেছে। নতুন সরকারের কাছে তাঁদের দাবি, যে বহরে পুলিশ কেস হচ্ছে, তা যেন কমে যায়। একইসঙ্গে জ্বালানি দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া বাড়ানোরও দাবি করেছেন তিনি।
১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের অবসান হয়েছে। এখন বাংলায় বিজেপির সরকার। যখন কোনও রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হয়, তখন একটা প্রত্যাশা রেখেই নতুন সরকারকে সুযোগ দেয় মানুষ। তাই, বিজেপি সরকারের থেকেও প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কি না বিজেপি সরকার, তা সময়ই বলবে।