
আরামবাগ: ফুচকার নাম শুনলেই অনেকেরই জিভে জল চলে আসে। শহর বা কিংবা গ্রাম, সব জায়গাতেই ফুচকার বিশেষ কদর রয়েছে। বিয়েবাড়ি থেকে অন্নপ্রাশন, যে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে এখন ফুচকার স্টল রাখা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তেঁতুলজল হল ফুচকার অন্যতম উপাদান। পাকা তেঁতুল, লেবুর রস, লঙ্কার গুঁড়ো, মুখরোচক মশলা দিয়ে তৈরি সেই জলের স্বাদ পেতেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন ফুচকাপ্রেমীরা। কিন্তু ওই জলের মধ্যে যে ঠিক কী আছে, জলটা আদৌ কতটা নিরাপদ, সেটা পরখ করতে গিয়েই চোখ কপালে স্বাস্থ্যকর্তাদের।
সম্প্রতি হুগলির খানাকুল এলাকায় বিভিন্ন ফুচকা বিক্রেতার কাছ থেকে জলের নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলিকে সরকারি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয়। সেই জল পরীক্ষা করে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগের। জলের মধ্যে মিলেছে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। রিপোর্ট দেখে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে স্বাস্থ্য কর্তাদের কপালে।
হুগলি জেলার স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে বিএমওএইচ-কে দিয়ে সম্প্রতি ফুচকা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগৃহীত জলের নমুনা পরীক্ষা করান খানাকুলের বিজেপি বিধায়ক সুশান্ত ঘোষ। সেই মতো সরকারি পরীক্ষাগারে মোট চারটি জায়গার ফুচকার জলের নমুনা পাঠানো হয়। তাতে দেখা গিয়েছে, প্রায় সবকটি নমুনাতেই বিপজ্জনক মাত্রায় ই-কোলাই ও কলিফর্ম ব্যাক্টিরিয়া রয়েছে। তাই সেগুলিকে ‘অসুরক্ষিত’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের ব্যাখ্যা, যাঁরা রাস্তায় ফুচকা বিক্রি করেন, তাঁদের অনেকেই স্বাস্থ্য-সুরক্ষা বিধি মেনে চলেন না। অনেকে নোংরা হাতেই ফুচকার আলু মাখেন, সেই হাত দিয়েই আবার জলে মশলা মেশান। জলের হাঁড়ি ঠিকমতো চাপা দেওয়া না হলে বর্ষাকালে তাতে বৃষ্টির জল মিশে যায়, তাতেও বাড়ে বিপদ। এছাড়া যে হাত দিয়ে তিনি টাকা গুণছেন, সেই হাত দিয়েই ফুচকায় আলু মাখা ও টক জল ভরে ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন বিক্রেতারা। তাতেই বিপদ বাড়ছে।
পরীক্ষাগারের ব্যাকটেরিওলজিস্ট জানাচ্ছেন, কলিফর্ম মিশ্রিত দূষিত জল পান করলে ডায়েরিয়া, বমি, পেটের সংক্রমণ, জ্বর, লিভারের সমস্যা-সহ বিভিন্ন ধরনের রোগ হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে সেটা অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।
জেলা প্রশাসন সূত্রের খবর, সেই রিপোর্ট হাতে আসার পরই সংশ্লিষ্ট ফুচকা বিক্রেতাদের শুধুমাত্র মিনারেল ওয়াটার ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, নোংরা হাতে মাখানো হচ্ছে আলু-কাঁচালঙ্কা, পুদিনা ও ধনেপাতা ভালো করে ধোয়া হচ্ছে না। বৃষ্টির জল মিশছে ফুচকার জলে। খোলা জায়গায় দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকছে আলু মাখা।
খানাকুলের বিধায়ক জানিয়েছেন, আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বিষয়টিকে। ভবিষ্যতে ফুচকা বিক্রেতাদের লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে। তিনি বলেন, “রিপোর্টটা দেখার পরে আমরা সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছি। ফুচকা তথা পানিপুরিতে যে টক জল দেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যেই বিপদ লুকিয়ে আছে। নমুনা পরীক্ষায় ভয়ঙ্কর সব ব্যাক্টিরিয়ার সন্ধান মিলেছে। অথচ, যাঁরা ফুচকা খাচ্ছেন, তাঁরা কিছুই টের পাচ্ছেন না। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। যাঁরা ফুচকা বিক্রি করেন, তাঁরা খুবই গরিব মানুষ। তাঁদেরও সাবধান থাকা উচিত। আমি গরিব বলে বিষ বিক্রি করতে পারি না।” তাঁর সাফ কথা, ‘নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনেই ফুচকা বিক্রি করতে হবে। ফুচকার টক জল বানাতে হবে মিনারেল ওয়াটার দিয়েই।’
সেই সঙ্গে বিধায়কের আবেদন, ‘রাস্তার ধারে খাবার কেনার আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং খাবার জলের মান সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। বিশেষ করে ছোট ছোট শিশুদের দূষিত জল খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন। সুস্থ থাকতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।’
আরামবাগ হাইস্কুলের পাশে ফুচকা বিক্রি করেন দীনেশ রাম। তিনি বলেন, ‘আমি পরিষ্কার জল দিয়েই ফুচকা বিক্রি করি। আমার ফুচকা খেয়ে কারও কোনও দিন শরীর খারাপ করেনি।’