
গোঘাট: কোথাও পুরুষদের দাপট, কোথাও বড় বাজেটের পুজোর জাঁকজমক। আর গোঘাটের প্রত্যন্ত রয়ান গ্রামে দুর্গাপুজোর পুরো দায়িত্বই মহিলাদের কাঁধে। গত ১৬ বছর ধরে গ্রামের মহিলারা নিজেরাই বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল ও চাঁদা সংগ্রহ করছেন, নিজেরাই পুজোর আয়োজন করছেন, আবার নিজেরাই মঞ্চে উঠে যাত্রা-নাটকও করছেন। প্যান্ডেলের খরচ বাঁচিয়ে সেই মহিলারাই তৈরি করেছেন গ্রামের ভিতর একটি দুর্গা মন্দির (Durga Puja 2026)। সেই মন্দিরকে ঘিরেই এবারও শুরু হয়েছে ১৭ তম বর্ষের দেবীপক্ষের প্রস্তুতি। প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা।
কোথায় হয় এই পুজো?
একদিকে পূর্ব বর্ধমান, অন্যদিকে বাঁকুড়া জেলা। সেই সীমান্তঘেঁষা গোঘাটের রয়ান গ্রামে দুর্গাপুজো মানেই অন্যরকম আবেগ। গ্রামের একমাত্র দুর্গাপুজোটি গত ১৬ বছর ধরে সম্পূর্ণভাবে পরিচালনা করে আসছেন গ্রামের মহিলারাই। পাড়া গ্রামের মহিলারা একজোট হয়ে নিজেদের উদ্যোগে এই পুজোর আয়োজন করে আসছেন।
হুগলির গোঘাটের রয়ান গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই কৃষক ও দিনমজুর শ্রেণির। হাতে গোনা কয়েকজন সরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন। সেই সাধারণ পরিবারের মহিলারাই নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলে বছরের পর বছর ধরে এই দুর্গাপুজো চালিয়ে আসছেন। পুজোর জন্য কারও কাছে বড় আর্থিক সাহায্যের অপেক্ষা না করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল ও চাঁদা সংগ্রহ করেন তাঁরা। নিজেদের শ্রম, গ্রামবাসীদের সহযোগিতা এবং পারস্পরিক উদ্যোগেই গড়ে উঠেছে এই পুজো।
পুজোর ব্যস্ততা শুরু…
পুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত গ্রামের মহিলারা। সকাল থেকেই দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন তাঁরা। কারও কাছ থেকে চাল, কারও কাছ থেকে টাকা-পয়সা, আবার কারও কাছ থেকে পুজোর জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা সংগ্রহ করছেন। পুজো ও পাঁচ দিন ধরে চলা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খরচ মেটাতেই চলছে এই চাঁদা সংগ্রহ। এক সময় প্যান্ডেল তৈরি করেই পুজোর আয়োজন করা হত। তবে প্যান্ডেলের খরচ বাঁচিয়ে গ্রামের মহিলারাই উদ্যোগ নিয়ে গ্রামের ভিতর ৭-৮ বছর আগে তৈরি করেছেন একটি আস্ত দুর্গা মন্দির। সেই মন্দিরেই এখন পুজোর প্রস্তুতি চলছে। এখনও অবশ্য প্রতিমা এসে পৌঁছয়নি।
এই বছরের কী প্ল্যান?
পাশের গ্রামেই তৈরি হচ্ছে প্রতিমা। ১৭ তম বর্ষে দুর্গাপুজোকে ঘিরে এবারও রয়েছে নানা অনুষ্ঠান। নিত্য অনুষ্ঠান, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, মিউজিক্যাল চেয়ার, শঙ্খ বাজানো, মহিলাদের নাটক এবং গ্রামবাসীদের যাত্রাপালা সব মিলিয়ে পাঁচ দিন ধরেই নানা আয়োজন থাকছে। পুজোর পাশাপাশি গ্রামবাসীদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে। ফলে এবারের পুজো ও অনুষ্ঠান ঘিরে খরচও বেড়েছে অনেকটাই।
ইতিমধ্যেই গ্রামের দুর্গা মন্দিরের ভিতর চলছে যাত্রা ও নাটকের মহড়া। গ্রামের মহিলারাই নাটক ও যাত্রায় অংশ নেবেন। তাঁদের উৎসাহ দিতে গ্রামের পুরুষ সদস্যরাও এগিয়ে এসেছেন। তাঁরাও যাত্রার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। ফলে পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই গ্রামে শুরু হয়েছে সাজো সাজো রব। এই পুজোকে ঘিরে গ্রামের মানুষের আবেগও কম নয়। আগে গ্রামে দুর্গাপুজো না হওয়ায় অনেকেই বাইরে ঠাকুর দেখতে যেতেন। কিন্তু গ্রামের ভিতরেই মন্দিরে দুর্গাপুজো শুরু হওয়ার পর সেই ছবি বদলেছে।
এখন পুজোর দিনগুলিতে গ্রামের মানুষজন বাইরের পুজো দেখতে না গিয়ে নিজেদের গ্রামের পুজোতেই মেতে থাকেন। পাঁচ দিন ধরে মন্দির ও তার আশপাশের এলাকাই হয়ে ওঠে গ্রামের মানুষের মিলনস্থল। শুধু দুর্গাপুজোতেই থেমে নেই গ্রামের মহিলাদের এই উদ্যোগ। দুর্গাপুজোর পর এই মন্দিরেই আয়োজন করা হবে লক্ষ্মীপুজোর। সেখানেও থাকবে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। অর্থাৎ বছরের বিভিন্ন সময়ে গ্রামের মানুষের একসঙ্গে হওয়ার একটি জায়গা হয়ে উঠেছে মহিলাদের উদ্যোগে তৈরি এই মন্দির। ১
৬ বছর ধরে নিজেদের উদ্যোগে, নিজেদের পরিশ্রমে এবং গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় দুর্গাপুজো করে আসছেন হুগলির কুমারগঞ্জ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এলাকা রয়ান গ্রামের মহিলারা। কৃষক, দিনমজুর ও সাধারণ পরিবারের মহিলাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই পুজো এখন গ্রামের মানুষের মিলনকেন্দ্র।
পুজো উদ্যোক্তা কী বলছেন?
পুজো কমিটির সদস্য পদ্মা পণ্ডিত বলেন, “আমরা বাড়ি বাড়ি যাই। টাকা পয়সা তুলি। চাল তুলি। গিয়ে পুজো করি। প্রত্যেক মহিলা পুজোর পর আমাদের সহযোগিতা করে। সকলে আসে।”