
দাসপুর: নাম, পদবি একই। মানসী মাইতি। একই ব্লকের দুটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা তাঁরা। দু’জনেরই স্বামী মারা গিয়েছেন। আবেদন করার ৬ বছর পরও এক মানসীর অ্যাকাউন্টে বিধবা ভাতার টাকা না ঢুকলেও অন্য মানসীর অ্যাকাউন্টে সেই টাকা ঢুকছে। এক মানসী ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে সিপিএমের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। অভিযোগ, তিনিই অপর মানসীর বিধবা ভাতার টাকা আত্মসাৎ করে চলেছেন। ডবল বিধবা ভাতা পাচ্ছেন পঞ্চায়েতে ভোটে লড়া তৃণমূলের মানসী মাইতি। এদিকে ৬ বছর ধরে ভাতার টাকা না পেয়ে প্রশাসনের দুয়ারে হন্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অন্য মানসী মাইতি। ডবল ভাতা পাওয়ার ঘটনা সামনে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরে। এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পঞ্চায়েত ও ব্লক প্রশাসন।
জানা গিয়েছে, দাসপুর-২ ব্লকের পলাশপাই গ্রাম পঞ্চায়েতের জোতকেশব গ্রামের বাসিন্দা মানসী মাইতি(৪৬)। তাঁর স্বামী শিশির মাইতি ২০১০ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে মারা যান। একচিলতে ছিটেবেড়ার অ্যাসবেস্টসের ছাউনি ঘেরা বাড়িতে একাই থাকেন তিনি। দু’কাঠার মতো জমি রয়েছে। সঙ্গে ভাগ চাষ করে তাঁর সংসার চলে বলে তিনি জানিয়েছেন। ২০২০ সালে দুয়ারে সরকার শিবিরের মাধ্যমে বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করেন তিনি। আবেদন অনুমোদনও হয়।
তাঁর দাবি, আবেদন করার পর এখনও পর্যন্ত তাঁর অ্যাকাউন্টে বিধবা ভাতার টাকা ঢোকেনি। টাকা না পেয়ে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে খোঁজ খবরও নেন। বিধবা ভাতার টাকা পেতে ২০২১ সালে ১৪ ডিসেম্বর ব্লক প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদনও জানান। তিনি জানান, পঞ্চায়েত আর ব্লক প্রশাসনের কাছে গেলে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে। প্রশাসনের কাছে তাঁকে এও শুনতে হয়, ভাতার টাকা পাওয়ার পরও তিনি নাকি মিথ্যা বলছেন।
প্রশাসনের তথ্য অনুসারে মানসী মাইতির অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে ঠিকই। কিন্তু, এতদিন সেই টাকা পেয়ে এসেছেন অন্য মানসী মাইতি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের দুয়ারে ঘুরে শুনতে হয়েছে যে, মানসী মাইতি নামের মহিলা তো বিধবা ভাতা পাচ্ছেন। অথচ মানসী মাইতির দাবি, তাঁর একটি মাত্র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। তাতে বিধবা ভাতার কোনও টাকাই ঢোকেনি। প্রায় ৬ বছর ধরে ভাতার টাকা পেতে প্রশাসনের দুয়ারে ঘুরেও সুরাহা মেলেনি বলে অভিযোগ।
তাহলে জোতকেশব গ্রামের মানসী মাইতির বিধবা ভাতার আবেদন অনুমোদন হওয়ার পরও তাঁর টাকা যাচ্ছে কোথায়? সম্প্রতি মানসী মাইতি পরিচিত কয়েকজনের কাছে পুনরায় তাঁর ভাতা না পাওয়ার বিষয়টি জানান। তাঁরাই খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন, মানসী মাইতি একজন নেই। আরও একজন মানসী মাইতির হদিস পান তাঁরা। অপর আর এক মানসী মাইতির অ্যাকাউন্টে জোতকেশব গ্রামের মানসী মাইতির বিধবা ভাতার টাকা ঢুকছে। শুধু তাই নই। ডবল বিধবা ভাতার টাকা পাচ্ছেন সেই মানসী। এই ঘটনা জানতে পেরে মানসী মাইতি জানান, ৬ বছরের তাঁর প্রাপ্য টাকা পাচ্ছেন দাসপুর-২ ব্লকের জোতঘনশ্যাম পঞ্চায়েতের নারায়ণচক গ্রামের অপর এক মানসী মাইতি(৪৪)।
জানা গিয়েছে, নারায়ণচক গ্রামের মানসী মাইতির স্বামী কালীপদ মাইতি বছর পাঁচেক আগে মারা গিয়েছেন।তাঁর দুটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিধবা ভাতার টাকা ঢুকছে। নিজের ভাতার টাকার পাশাপাশি জোতকেশব গ্রামের মানসী মাইতির ভাতার টাকাও পাচ্ছেন তিনি। মাসে মাসে সেই টাকা তিনি তুলেও নিতেন। ডবল বিধবা ভাতার টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন নারায়ণচক গ্রামের মানসী মাইতি।
তাঁর বক্তব্য, “আমি আমার বিধবা ভাতার টাকা পাচ্ছি। আমার অন্য একটি অ্যাকাউন্টেও হাজার টাকা করে ঢুকত।” সেটি কিসের টাকা তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন। ইতিমধ্যে স্থানীয় পঞ্চায়েতের লোকজন নারায়ণচকে মানসী মাইতির বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে। ব্লক অফিসে তাঁকে ডাকাও হয়েছে।
জানা গিয়েছে, নারায়ণচক গ্রামের মানসী মাইতি ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূলের টিকিটে পঞ্চায়েতের প্রার্থী হয়েছিলেন। যদিও সিপিএম প্রার্থীর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে তৎকালীন সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেই কি ডবল বিধবা ভাতা পেয়েও কাউকে না জানিয়ে সেই টাকা মাসের পর মাস তুলছিলেন মানসী মাইতি? দাসপুর ২ ব্লক প্রশাসন সূত্রে খবর, দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে।