
কেতুগ্রাম: একদিকে নদীর ভাঙন। অন্যদিকে বেহাল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই দুইয়ের জেরে ক্রমশ জনশূন্য হয়ে পড়ছে পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের বেগুনকোলা গ্রাম। একসময় যেখানে ছিল প্রায় ৫০০ পরিবারের বসবাস। সেখানে এখন মাত্র ৬০টি পরিবার। গত কয়েক বছরে একের পর এক পরিবার গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে। নদীভাঙনে হারিয়েছে ঘরবাড়ি, জমি, চাষের ক্ষেত। গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে এখন ঝোপ-জঙ্গলে ঢাকা পড়ে রয়েছে পরিত্যক্ত বাড়ি। কোথাও পড়ে রয়েছে ভাঙা দেওয়ালের ধ্বংসাবশেষ। সেই ধ্বংসস্তূপই যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে—একসময় এই গ্রাম ছিল জনবহুল।
অবস্থানগত দিক থেকে দুই দিক দিয়ে অজয় নদী বেষ্টিত এই গ্রাম। বর্ষা এলেই আতঙ্ক বাড়ে গ্রামবাসীদের। একসময় ছিল জনবহুল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ছবিটা বদলেছে। নদীভাঙন আর যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ছে বেগুনকোলা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, একসময় গ্রামে প্রায় ৫০০টি পরিবারের বসবাস ছিল। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০-এ।
বছরের পর বছর অজয়ের ভাঙনে গ্রাস হয়েছে ঘরবাড়ি, জমি এবং চাষের ক্ষেত। বর্ষা এলেই বন্যার জলে প্লাবিত হয় গ্রাম। আর সেই জল নামার সঙ্গে সঙ্গে নদীগর্ভে চলে যায় মানুষের সর্বস্ব। শুধু নদীভাঙন নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশাও গ্রাম ছাড়ার অন্যতম কারণ বলে দাবি বাসিন্দাদের। অভিযোগ, পঞ্চায়েত থেকে প্রশাসনের দফতরে দরবার করা হলেও ভাঙন রোধে কোনও কাজ হয়নি।
আবার এই গ্রামের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগের কার্যত একমাত্র মাধ্যম নৌকা। কিন্তু সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যায় নৌকা চলাচল। ফলে রাতের বেলায় কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে চরম সমস্যায় পড়তে হয় গ্রামবাসীদের। গ্রামে নেই কার্যত কোনও পাকা রাস্তা। বছরের পর বছর উন্নয়নের অপেক্ষায় রয়েছেন বাসিন্দারা।
গত সাত বছর ধরে ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে বেগুনকোলা। বহু পরিবার অন্যত্র গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে। আর যাঁরা এখনও গ্রামে রয়েছেন, তাঁদের অনেকেই আর্থিক কারণে গ্রাম ছাড়তে পারছেন না। কাঁধে বই-ভর্তি ব্যাগ নিয়ে গ্রামের বেহাল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তৃষা দাস নামে এক পড়ুয়া বলেন, “সবাই চলে যাচ্ছে। আমার বাবার ওপারে কোনও জায়গা নেই বলে যেতে পারছি না। এখানে অনেক কষ্ট।” একইসঙ্গে তাঁর আবেদন, রাস্তাঘাট একটু ঠিক করা হোক। তাহলে তাঁরা এখানেই থাকতে পারবেন।
তাঁর মতো গ্রামের বাসিন্দা ছন্দা মণ্ডল, রূপালি মণ্ডল, উজ্জ্বল দাস, বাবু ঘোষরা একই কথা বললেন। নদীভাঙন রুখতে স্থায়ী ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো—এই দাবিই এখন বেগুনকোলার বাসিন্দাদের। না হলে অজয়ের গ্রাসে শুধু জমি নয়, একদিন হয়তো মানচিত্র থেকেই মুছে যাবে গোটা গ্রাম।