
কেতুগ্রাম: রাজনৈতিক দল কিংবা প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে নয়। গ্রামবাসীদের শক্তি ও ইচ্ছাতেই বদলে যাচ্ছে একটি গ্রাম। পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের খেয়াইবান্দা গ্রামে উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি গ্রামবাসীরাই। রাস্তা সংস্কার, কমিউনিটি হল নির্মাণ, দাতব্য চিকিৎসালয়, কোচিং সেন্টার, দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো- সবই হচ্ছে গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে।
খেয়াইবান্দা গ্রামের প্রায় প্রত্যেক পরিবারেরই নিজস্ব চাষের জমি রয়েছে। তবে তার পাশাপাশি গ্রামের একটি বড় জমিতে প্রতি বছর যৌথভাবে চাষ করেন প্রায় সকল গ্রামবাসী। ওই জমি এক বছরের জন্য লিজ নেওয়া হয়। সেই জমি থেকে যে আয় হয়, তার একটি টাকাও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করা হয় গ্রামের সার্বিক উন্নয়নে। গ্রামবাসীদের দাবি, কোনও রাস্তা ভেঙে গেলে, পুকুরের পাড় ভাঙলে, পানীয় জলের সমস্যা দেখা দিলে কিংবা কোনও অসহায় পরিবারের চিকিৎসা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলে তাঁরা প্রশাসন বা রাজনৈতিক দলের সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকেন না। গ্রামের মানুষ নিজেরাই বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন এবং যৌথ তহবিল থেকে সেই সমস্যার সমাধান করেন।
শুধু তাই নয়, কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা বাইরে থাকা গ্রামের বাসিন্দারাও নিজেদের গ্রামের উন্নয়নের জন্য নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা করেন। ফলে যৌথ চাষের আয় এবং গ্রামবাসীদের অনুদান মিলিয়ে গড়ে উঠেছে একটি বড় কমিউনিটি হল। সেই ভবনেই চলছে বিনামূল্যের দাতব্য চিকিৎসালয়, কোচিং সেন্টার এবং গ্রামের যে কোনও পরিবারের সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ। এমনকি গ্রামের কোনও পরিবারে কারও মৃত্যু বা অসুস্থতার ঘটনায় স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে পাশে দাঁড়ান গ্রামের যুবকেরা।
গ্রামবাসীদের বক্তব্য, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে এই মডেলেই চলছে গ্রামের উন্নয়ন। তাঁদের দাবি, এই উদ্যোগে কোনও রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ নেই। গ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ থাকলেও উন্নয়নের প্রশ্নে সবাই একসঙ্গে কাজ করেন। গ্রামের বাসিন্দা বুদ্ধদেব পাল, স্বপন কুমার ঘোষরা বলছেন, “গ্রামের স্বার্থই আমাদের একমাত্র রাজনীতি।”
বর্তমান সময়ে যখন উন্নয়নের প্রশ্নে প্রায়শই রাজনৈতিক তরজা দেখা যায়, তখন খেয়াইবান্দা গ্রামের এই উদ্যোগ এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এখানে উন্নয়নের ভিত্তি কোনও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, আত্মনির্ভরতা এবং সামাজিক ঐক্য। এখন এই মডেল শুধু পূর্ব বর্ধমান নয়, অন্যান্য গ্রামের কাছেও একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।