
সুমন মহাপাত্র: বারুইপুরকাণ্ডে এনকাউন্টার। খতম এক অভিযুক্ত। ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে এনকাউন্টারে মৃত্যু এক অভিযুক্তের, যে নাবালিকাকে মূল অভিযুক্তের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।
কিন্তু কেন এনকাউন্টার?
আইও-র নেতৃত্বে একটি দল মঙ্গলবার রাত ১২.৪৫ মিনিট নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। অকুস্থল থেকে এই অভিযুক্তের বাড়ি থেকে খুব একটা বেশি দূরে নয়। একেবারেই জঙ্গলে ঘেরা পরিবেশ। আগাছা-জলাভূমি। জল কাদায় উঁচু উঁচু ঘাস। সেখানেই ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নিয়ে আসা হয় অভিযুক্তকে। পুলিশের দাবি, সেখানেই হঠাৎ অভিযুক্ত কর্তব্যরত এক পুলিশ কর্মীর পকেট থেকে বন্দুক বার করে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশ বাধা দিলে এক রাউন্ড গুলিও চালায় সে। তারপর আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। সেই গুলিতেই খতম অভিযুক্ত। জল কাদার ঝোপের মধ্যে পড়ে সে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে বারুইপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
গোটা ঘটনায় অভিযুক্তের ভূমিকা
এই গোটা অপরাধে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই অভিযুক্তের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্ডেন স্কুলের বাইরে লাগানো সিসিটিভি ফুটেজে নাবালিকার সঙ্গে একেই প্রথম দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। এই ফুটেজই প্রথম এলাকাবাসীর হাতে আসে, পরে তা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, লাল গেঞ্জি, মাথায় টুপি পরিহিত এই অভিযুক্ত নাবালিকাকে নিয়ে যাচ্ছে। নাবালিকা তার পাশেই হাঁটছিল। অভিযোগ, টাকার লোভে অভিযুক্তই মূল অভিযুক্তদের কাছে এ পৌঁছে দিয়েছিল। এলাকাবাসীরাই এই অভিযুক্তকে চিহ্নিত করে প্রথমে ধরে। আরও একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসে। যেখানে এলাকারই একজন অভিযুক্তকে নিয়ে ওই জলা জায়গায় যান। পুলিশের হাতে সেই ফুটেজও আছে।
তদন্তে অসহযোগিতা
পুলিশের দাবি, অভিযুক্তকে আটক যখন ক্যাম্পে নিয়ে যখন জেরা করে পুলিশ, তখনও প্রথম দিকে নানাভাবে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল অভিযুক্ত। পরে চাপের মুখে মূল অভিযুক্তের নাম সে বলে ফেলে। তার ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হয় আরও দু’জনকে। তবে অভিযুক্তের বয়ানে প্রথম থেকেই ছিল একাধিক অসঙ্গতি। SIT-এর এক শীর্ষ কর্তার কাছে বয়ান দেওয়ার পর দ্বিতীয় শীর্ষ কর্তার কাছে যখন বয়ান দিচ্ছিল, তাতে বিস্তর ফারাক ছিল।
হাতের তালুর মতো চিনত অভিযুক্ত
মাঝবয়সী এই অভিযুক্ত গোটা এলাকাটা হাতের তালুর মতো চিনত। এলাকার প্রত্যন্ত ওলিগলি, কোনও রাস্তা ধরলে সোজা পৌঁছে যাওয়া যেত সূর্যপুর স্টেশনে, সবটা খুব ভাল ভাবে জানত সে। পুলিশের দাবি, সে কারণেই ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশকে গুলি করে পালিয়ে স্টেশন পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল সে।
যে পুকুরে নাবালিকাকে বস্তাবন্দি করে ফেলা হয়েছিল, সেই পুকুরের পাশ দিয়েই জলাজঙ্গলের বুক চিরে স্টেশনের পিছনের দিকে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল সে। আর সে কারণেই এনকাউন্টার।
‘পুলিশের অধিকার এনকাউন্টার’
প্রাক্তন পুলিশ কর্তা অরিন্দম আচার্য বলেছেন, “নিজেকে আত্মরক্ষার্থে পুলিশের এনকাউন্টার করার অধিকার রয়েছে। পুলিশ যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, সেটা মৃতপ্রায় পুলিশ ফোর্সকে উজ্জিবীত করেছে।”
‘জিরো টলারেন্স’
মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবারই নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে বলে দেন, “যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে জিরো টলারেন্স। আগের বার পুলিশকে কাজে বাধা পেতে হচ্ছিল। পুলিশের কাজ করার অনুমতি ছিল না।”
পুলিশের কাজে প্রাথমিকভাবে অসন্তোষ থাকলেও পরেরদিকে নির্যাতিতার বাবাই তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “যতটুকুই কথা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তোমার আশা পূরণ হবেই। আমাদের একটাই দাবি, যে দোষী তার শাস্তি হোক। মুখ্যমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, তুমি শুধু দেখতে থাকো, আমরা কী করতে পারি। দাদার ওপর ভরসা রয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের ওপর ভরসা রয়েছে।”
ছেলের দেহ নিতে চান না মা
মঙ্গলবার সকালেই এই ঘটনায় আরও এক জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযুক্তের মা গতকালই সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, তাঁর ছেলে যা কাজ করেছে, তার এটাই হওয়ার ছিল। ছেলের দেহও আর আনতে যাবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।