
সুন্দরবন: একসময় গ্রামে ছাগল ও মুরগি বিক্রি করতেন। সুন্দরবনের প্রবীণ লোকেরা তাঁর সেই দারিদ্র দেখেছেন। এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। ২০ বিঘা জায়গায় উপর বাড়ি। সেই বাড়ির পাঁচিলই ৮০০ মিটার বিস্তৃত। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটা-দুটো নয়, পাঁচটা বাড়ি রয়েছে। সুন্দরবনের ‘বেতাজ বাদশা’ হয়ে উঠেছেন সুবিদ আলি ঢালি ওরফে ঝড়ো ঢালি। কী করেন তিনি? একজন নেতা। পাঠানখালি অঞ্চলের তৃণমূল কংগ্রেসের অঞ্চল সভাপতি এবং বর্তমান গোসাবা ব্লক তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতি। রাজ্যে পালাবদলের পরই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে।
সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের পাঠানখালি অঞ্চলে বাড়ি ঝড়ো ঢালির। এলাকার সাধারণ বাসিন্দা এবং বিজেপির অভিযোগ, গরিব মানুষের টাকা লুট করে, কাটমানি এবং জোরপূর্বক জমি দখলদারি করেই এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এই তৃণমূল নেতা। তাঁর ভয়ে তৃণমূল জমানায় এতদিন কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। এলাকায় তিনি মূলত ‘কাটমানি’, ‘দুর্নীতিবাজ নেতা’ হিসেবেই পরিচিত।
ঝড়ো ঢালির বিপুল সম্পত্তি-
২০ বিঘার জমির উপর রাজপ্রাসাদ: প্রায় ২০ বিঘা জমির উপর নির্মিত হয়েছে দুটি চোখধাঁধানো বিশাল রাজপ্রাসাদ। কড়া সুরক্ষার জন্য চারিদিকে রয়েছে ৮০০ মিটার লম্বা এবং ১৫ ফুট উঁচু বিশাল প্রাচীর। এই প্রাসাদের ভেতরেই রয়েছে দুটি বিশাল খালসম পুকুর এবং একটি বিলাসবহুল বাগানবাড়ি।
৪০ বিঘার খামারবাড়ি: সম্পূর্ণ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এক সুবিশাল ও বিলাসবহুল ফার্ম হাউস। যা গড়ে উঠেছে প্রায় ৩৫ বিঘা জমির উপর। এর ভেতরে রয়েছে আরও ১৫ বিঘার বিশাল খাল যুক্ত জলাশয়।
পাঠানখালিতে বিশাল ভেড়ি: পাঠানখালির বটতলি এলাকায় রয়েছে এই তৃণমূল নেতার প্রায় ৬৫ বিঘা জমির এক সুবিশাল মাছের ভেড়ি।
গোসাবায় ৫টি আলিশান বাড়ি: শুধুমাত্র সুন্দরবনের গোসাবা এলাকাতেই এই নেতার মোট ৫টি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে।
প্রাসাদোপম পার্টি অফিস: দলীয় কার্যালয় বা পার্টি অফিস হলেও এর আয়তন ও জাঁকজমক কোনও প্রাসাদের
চেয়ে কম নয়। এই অফিস দেখলে বড় বড় মন্ত্রীদের কার্যালয়ও হার মেনে যাবে।
তৃণমূলের পার্টি অফিস
শহরাঞ্চলে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট: সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়িয়ে কলকাতা, হাসনাবাদ এবং বসিরহাটেও রয়েছে তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, সুন্দরবনের এই ‘বেতাজ বাদশা’র জীবনযাপনও রাজকীয়। বর্তমানে গোসাবা এবং কলকাতা মিলিয়ে এই নেতার নাকি ৩ জন ‘রানি’ অর্থাৎ স্ত্রী রয়েছেন।
কে এই ঝড়ো ঢালি? শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়ার কাহিনি-
গ্রামবাসীদের দাবি, বর্তমানের এই দাপুটে তৃণমূল নেতা সুবিদ আলি ঢালি ওরফে ঝড়ো ঢালি একসময় অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন। গ্রামে ছাগল ও মুরগি বিক্রি করাই ছিল তাঁর পেশা। কিন্তু রাজ্যে তৃণমূল জমানার পত্তন হতেই তাঁর ভাগ্যের চাকা এক লাফে ঘুরে যায়। পাঠানখালি তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি থেকে শুরু করে পরবর্তীতে তিনি গোসাবা ব্লক তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতি হন।
তাঁর রাজনৈতিক দাপট এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, গোসাবার তৃণমূলের নেতাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন তিনি নিজেই—কে এলাকার বিধায়ক (MLA) হবেন, তাও ঠিক হত তাঁর অঙ্গুলিহেলনে।
নির্বাচনী আবহে গোসাবায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভায় খোদ অভিষেকের সঙ্গেই সরাসরি কথা বলতে দেখা গিয়েছিল ঝড়ো ঢালিকে। দলের উচ্চতলার নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর যে সুসম্পর্ক ছিল, তা স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার করেই ঝড়ো ঢালি এলাকার দরিদ্র আদিবাসী মানুষদের ঋণ দেওয়ার ফাঁদে ফেলতেন। বিঘা প্রতি মাত্র ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা ধার দিয়ে স্ট্যাম্প পেপারে সই করিয়ে নিতেন তিনি। পরবর্তীতে সেই ঋণের দায়ে এবং ক্ষমতার জোরে গরিব মানুষের জমি নিজের নামে লিখিয়ে নিতেন।
এর চেয়েও বড় বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন গ্রামবাসীরা। ক্যামেরার সামনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জোর করে এলাকার একাধিক মহিলাকে বিয়ে করেন এই তৃণমূল নেতা। এরপর তাঁদের সর্বস্ব লুট করে, সমস্ত টাকা-পয়সা এবং জমি-জায়গা জোরপূর্বক আত্মসাৎ করাই ছিল তাঁর আসল উদ্দেশ্য। এভাবেই শোষণ ও অত্যাচারের রাজত্ব চালিয়ে সাধারণ ছাগল বিক্রেতা থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছেন সুন্দরবনের এই ‘বেতাজ বাদশা’।
এই চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির খতিয়ান সামনে আসতেই বর্তমানে তোলপাড় গোটা গোসাবা। পুলিশ সূত্রে খবর, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন মেটার পর থেকেই পাঠানখালি এলাকায় চরম রাজনৈতিক সন্ত্রাস চালানোর মূল কারিগর ছিলেন এই ঝড়ো ঢালি। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি কর্মীদের নৃশংস মারধর, তাঁদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা, লুটপাট এবং লাগাতার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। সম্প্রতি পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিজের বিলাসবহুল প্রাসাদ ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন এই তৃণমূল নেতা। গোসাবা থানার পুলিশ তাঁর সমস্ত সম্ভাব্য ডেরায় তল্লাশি চালাচ্ছে।