
ক্যানিং: ছিল ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। হয়ে গেল ‘নেতাজি পল্লি’। নদীর ধারে গজিয়ে উঠল কলোনি। আর সেই কলোনিতে মা-মাটি-মানুষের দল তৃণমূলের নেতারা ‘মাটি’ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ। দুর্নীতির এই ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে। মাতলা ব্রিজে যাওয়ার রাস্তার ডান দিকে থাকা আস্ত একটি ম্যানগ্রোভ জঙ্গল কেটে, নদীর চর ভরাট করে তৈরি হয়ে গিয়েছে এক বিশাল কলোনি।
সুন্দরবনের ‘রক্ষাকবচ’ ম্যানগ্রোভ ধ্বংস এবং জলাশয় বেআইনিভাবে ভরাটের ছবি ধরা পড়ল টিভি ৯ বাংলার ক্যামেরায়। তৃণমূল নেতারা জঙ্গল কেটে তৈরি নতুন কলোনির নাম দিয়েছেন ‘নেতাজি পল্লি’। বর্তমানে এই কলোনিতে কয়েকশো মানুষের বসবাস। কিন্তু এই বসতি গড়ে ওঠার পিছনে নানা অভিযোগ সামনে আসছে।
গরিবদের থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ-
টিভি৯ বাংলার প্রতিনিধি পৌঁছে গিয়েছিলেন ওই কলোনিতে। কথা বলেন কলোনির বাসিন্দাদের সঙ্গে। গ্রামবাসীদের বিস্ফোরক দাবি, এই চরের জমি পাওয়ার জন্য তাঁরা কেউ ২ লক্ষ, কেউ ৪ লক্ষ, আবার কেউ ৫ লক্ষ টাকা করে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। গরিব অসহায় মানুষগুলো শাসকদলের নেতাদের কথায় ভরসা করেই সেখানে ঘর বেঁধেছেন। কিন্তু এত টাকা দেওয়ার পরও তাঁদের কোনও সরকারি বা আইনি দলিল দেওয়া হয়নি।
মানবিকতার আড়ালে জালিয়াতি, ক্লাবের লেটারহেডই ‘দলিল’-
টাকা দেওয়ার প্রমাণ কিংবা দলিল দেখতে চাওয়া হলে গ্রামবাসীরা একটি কাগজ দেখান। যা দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে। কোনও সরকারি কাগজ নয়, ‘প্রান্তিক সঙ্ঘ’ নামের একটি স্থানীয় ক্লাবের প্যাড বা লেটারহেডকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সেখানে অত্যন্ত ‘মানবিক’ ভাষায় লেখা রয়েছে, “১ নম্বর দিঘির পাড় মাতলা নদীর চরে বাসস্থানের উপযুক্ত জায়গা সংরক্ষিত আছে। যে সমস্ত পরিবার বাসস্থানহীন অথবা গৃহহীন অবস্থায় দিনযাপন করছে, তাদের কথা ভেবে দীন দরিদ্র পরিবারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”
খাতায়-কলমে এই মানবিকতার কথা লেখা থাকলেও, কোন গরিব মানুষের থেকে কত লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছে, তার কোনও উল্লেখ নেই ওই ক্লাবের প্যাডে। এই কাগজে বড় বড় অক্ষরে সই রয়েছে ক্লাবের সম্পাদক তপন জানার। খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, এই তপন জানা এলাকার একজন অত্যন্ত সক্রিয় তৃণমূল কর্মী।
শুধু তপন জানাই নন, গ্রামবাসীদের মুখে উঠে এসেছে একাধিক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার নাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যানিংয়ের প্রাক্তন তৃণমূল প্রধানের স্বামী গোপাল কুণ্ডু এবং তাঁর ভাই সুভাষ কুণ্ডু সরাসরি এই টাকা তোলার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বর্তমানে এই কলোনিতে শতাধিক মানুষ বসবাস করছেন। সুন্দরবনের ফুসফুস তথা বাংলার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী ম্যানগ্রোভ জঙ্গল কেটে, নদীর চর ভরাট করে জমি বিক্রি করার এই চক্রটি কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে বলে অভিযোগ। দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।