
ইটাহার: প্রায় ছয় বছর কেটে গিয়েছে। বিচারের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু, গতকাল টিভিতে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কথা শুনে ফের বিচার পাওয়ার আশা জেগেছে। পুলিশি লক আপে ছেলের মৃত্যুর এবার বিচার পাবেন বলে আশাবাদী উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের নন্দনগ্রামের গীতারানি দাস। ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বললেন, “নতুন মুখ্যমন্ত্রীর কথায় আশার আলো দেখছি।”
উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে পুলিশি লক আপে তৃণমূল কর্মীর মৃত্যুতে মুখ্যমন্ত্রী নিজে গিয়ে মৃতের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। এবং অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশের বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই নন্দনগ্রামের গীতারানি দাসের আশা, এবার তিনি বিচার পাবেন।
এদিন ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে ৬ বছর আগের সেই ঘটনার কথা জানালেন তিনি। ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর। লকডাউনের সেই নিস্তব্ধ দিনে নন্দনগ্রামের একটি দোকানের সামনে থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ দু’টি মোটরবাইকে করে তাঁর বছর কুড়ির ছেলে অনুপ কুমার রায়কে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ পরিবারের। বেলা ১১টা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন অনুপ। বলেছিল, “একটু আসছি।” কিন্তু আর ফেরা হয়নি।
খেলাধুলোয় পারদর্শী অনুপের স্বপ্ন ছিল দেশের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া। আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবং বিজেপি যুব মোর্চার কর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ অনুপের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। শেষপর্যন্ত রায়গঞ্জ থানায় ডাক আসে। রাতে পরিবার জানতে পারে, পুলিশ লক আপে অসুস্থ হয়ে অনুপের মৃত্যু হয়েছে।
গীতাদেবীর অভিযোগ, এরপর শুরু হয় আরও এক যন্ত্রণা। রাতের অন্ধকারে রায়গঞ্জ পুলিশ মর্গে ময়নাতদন্ত করা হয়। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ময়নাতদন্ত কিংবা দেহ হস্তান্তরের কোনও কাগজে সই নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ। দ্রুত দেহ নিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য পুলিশের চাপ এবং লাগাতার হুমকির অভিযোগও তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ঘটনার প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা হয়েছিল এবং বিচার চেয়ে অভিযোগ জানানোর সুযোগও পরিবার পায়নি। কেন সেদিন অনুপকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তা জানতে পারেনি পরিবার। তবে অভিযোগ, বিজেপি করায় তৃণমূল নেতাদের কথায় অনুপকে পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল।
প্রায় ছয় বছর পরও অনুপের ঘরটি যেন সেই দিনের স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে রয়েছে। টিনের চালার ঘরে ঝুলছে খেলাধুলোর একের পর এক মেডেল। রয়েছে বিজেপি লেখা সেই রঙিন উত্তরীয়, দলীয় কর্মসূচিতে যাওয়ার সময় যা গলায় পরতেন অনুপ। ছেলের স্মৃতিতে আজও চোখের জল থামে না মায়ের।
গীতাদেবীর অভিযোগ, শুধুমাত্র বিজেপি করার কারণেই তাঁর ছেলেকে পুলিশ মেরে ফেলেছে। বহু প্রলোভন এবং চাপ উপেক্ষা করেও বিচার পাওয়ার আশায় এতদিন অপেক্ষা করেছেন তিনি। কথা বলতে গেলেই আজও স্মৃতির ভারে হারিয়ে ফেলেন নিজেকে। তবে ২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ছেলেকে হারানোর সেই দিনটি ভুলতে পারেননি।
হালিশহরের ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন।এই খবর শুনে আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে গীতাদেবীর। বলেন, “ভালো কথা, সত্যিই খুব ভালো কথা।” তাঁর একটাই আশা, অনুপের লকআপে মৃত্যুর ঘটনাতেও যদি একইভাবে তদন্ত হয়, তাহলে হয়তো ছয় বছর পর তিনি তাঁর ছেলের বিচার পাবেন। ভাইয়ের মৃত্যুর বিচার চান অনুপের দিদি রিঙ্কু রায়।