
বালুরঘাট: ১৫ অগস্ট দেশ স্বাধীনতা পেলেও, বালুরঘাটবাসী স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল ১৮ অগস্ট। ভারত স্বাধীন হওয়ার তিন দিন পর অর্থাৎ ১৮ অগস্ট দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা সদর বালুরঘাট স্বাধীন হয়েছিল। এদিনই সরকারিভাবে বালুরঘাট স্বাধীন হয়েছে এই ঘোষণা করা হয়।
এত দিন ১৮ অগস্ট বালুরঘাটের স্বাধীনতা দিবসের দিনটি সরকারি ভাবে পালন করা হয়নি। যা নিয়ে শহরবাসীর মধ্যে আক্ষেপও ছিল। বিগত দিনে শুধুমাত্র বিজেপি ও একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে দিনটি পালন করা হত। তবে আগামী বছর থেকে দিনটি সরকারিভাবে যেন পালন করা হয়, তার জন্য বালুরঘাটের বিধায়ককে দ্বায়িত্ব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার।
মঙ্গলবার দুপুরে বিজেপির পক্ষ থেকে বালুরঘাট হাইস্কুল মাঠে দিনটি বড় করে পালন করা হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, বালুরঘাটের বিধায়ক বিদ্যুৎ কুমার রায়, বিজেপির জেলা সভাপতি স্বরূপ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক বাপি সরকার সহ অন্যান্য পদাধিকারীরা। এদিন বালুরঘাট স্টেডিয়ামে সরকারি জব ফেয়ারে আজকের দিনের গুরুত্ব তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার।
এ দিন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, “বালুরঘাট ১৮ অগস্টকে বিশেষভাবে স্মরণ করে। আশেপাশের জেলাগুলির প্রকৃত স্বাধীনতা দিবস হল ১৮ অগস্ট। ভারত যখন স্বাধীন হয়েছিল, তখন এই সব জেলাগুলি পাকিস্তানে ছিল। তৎকালীন যুগে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সহ এখানকার স্থানীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয় বাসিন্দারা মিলে এই দক্ষিণ দিনাজপুরকে, যা তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুর ছিল, তাকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে। ভারতীয় জনতা পার্টি ২০০৮ সাল থেকে এই দিনটা পালন করে আসছে। আমরা তিরঙ্গা যাত্রা করি। ক্ষমতায় আসার আগেও এই দিনটি পালন করেছি আমরা এবং আগামিদিনেও করব।”
স্যর সিরিল র্যাডক্লিফের ঘোষণা অনুসারে ১৯৪৭ সালে ১৪ অগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ অগস্ট ভারত স্বাধীন হয়েছিল। ১৫ অগস্ট যখন ভারতবাসী স্বাধীনতার আনন্দে মাতোয়ারা ছিল, তখন আজানা আশঙ্কা নেমে এসেছিল বালুরঘাটবাসীদের মধ্যে। ১৯৪৭-র ১৪ অগস্ট রাতে পাকিস্থানি সৈন্য বাহিনী ও পাকিস্তানি নেতারা বালুরঘাট হাইস্কুলে হাজির হয়। ১৫ অগস্ট মহকুমা শাসক বালুরঘাটে পানাউল্লা পাকিস্তানের পতাকা তোলেন। শহরের নাট্যমন্দির থেকে জেলা সদর আদালত পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে পাকিস্তানি পতাকায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল। সেই সময় বালুরঘাটের সাধারণ মানুষ ও পাকিস্তানি ফৌজের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। বেশ কিছু জায়গায় সাধারণ যুবক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা সশস্ত্র ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু তদানীন্তন বালুরঘাট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কুমুদরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের সাহসিকতায় পাকিস্তানিরা সে দেশের পতাকা হাইস্কুল চত্বরে তুলতে পারেননি। সেই সময় স্যর সিরিল র্যাডক্লিফ বালুরঘাট সহ রায়গঞ্জ ও অসমের বেশ কিছু এলাকাকে ‘নোশনাল এরিয়া’ (Notional Area) বলে ঘোষণা করেছিলেন।
অবশেষে ১৭ অগস্ট অধুনা বাংলাদেশের ধামারহাট, পোরসা, পত্নীতলা, থানাবাদ দিয়ে বালুরঘাট সহ মোট পাঁচটি থানা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮ অগস্ট সকালে বালুরঘাটে ভারতীয় জওয়ানরা দখল নেয়। পাকিস্তানি সেনাদের বালুরঘাট ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপরই পাকিস্তানি সৈন্যরা ফিরে যায়।
১৮ অগস্ট প্রশাসনিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, বালুরঘাট স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীন বালুরঘাটে প্রথম সরোজরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় জাতীয় পতাকা তোলেন। এরপর ১৯ অগস্ট বালুরঘাট হাই স্কুল ময়দানে স্বাধীনতার বিজয় উৎসব পালন করে বালুরঘাটবাসী। ১৮ অগস্ট বালুরঘাট স্বাধীন হলেও, সারা দেশের সঙ্গে ১৫ অগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়।
এদিন বালুরঘাট হাইস্কুল মাঠ থেকে বালুরঘাট সাইকেল কমিউনিটির তরফে দিনটি পালন করা হয়। বালুরঘাটের স্বাধীনতা সংগ্রামী পুলিন বিহারী দাসগুপ্ত ও সরোজ রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন পালন করেন বালুরঘাট সাইকেল কমিউনিটির সদস্যরা।