
ঢাকা: বাংলাদেশে ভোট হচ্ছে। ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে হাসিনা সরকারের পতনের পর পদ্মা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। দীর্ঘ টালবাহানার পর অবশেষে মহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন করাতে রাজি হয়েছে। তবে এই নির্বাচনে নেই হাসিনার দল আওয়ামী লীগই। তারা ‘নিষিদ্ধ’ বাংলাদেশে। আর এই সুযোগেই বাংলাদেশে অ্যাডভান্টেজে প্রধান প্রতিপক্ষ দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ভোটের ময়দানে না থাকা মানে যে সরাসরি অ্যাডভান্টেজ বিএনপি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু, গত ১৭ মাসে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে যে অনেক জল বয়ে গিয়েছে, তাই ঠিক ২০২৪ সালের অগস্টের পরপরই যতটা বুক ঠুকে অ্যাডভান্টেজ বিএনপি বলা যাচ্ছিল, তা এখন আর অতটা প্রত্যয়ের সঙ্গে বলা যাচ্ছে না। তবু বিএনপি তুলনায় কেন অনেকটাই এগিয়ে আছে কোন কোন জায়গায়?
প্রথমেই যে ক্ষেত্রে এগিয়ে, তা হল, ইতিহাস ও পরম্পরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেমন জাতির পিতা। তেমনই শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। স্বাধীন বাংলাদেশকে সব থেকে বেশি দিন শাসন করেছে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ও জিয়াউর রহমানের বিএনপি (BNP)-ই। আওয়ামী লীগ যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের ঐতিহ্য ও পরম্পরা বলে মনে করে, বিএনপি-ও ঠিক তাই। অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএনপি-তেও ছিলেন বা এখনও কয়েকজন রয়েছেন। তাই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরম্পরার প্রশ্নে আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনী ময়দানে বিএনপি বাকিদের থেকে অনেক এগিয়ে।
দ্বিতীয়ত, সংগঠন। উপমহাদেশে ভোট জিততে গেলে লাগে সংগঠন। আর সেই সংগঠন ক্ষমতায় থাকলে যথেষ্ট পোক্ত হয়। জিয়াউর রহমানকে ধরলে বিএনপি (BNP) মোট ৩ দফায় বাংলাদেশ শাসন করে ফেলেছে। ফলে, একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত যেমন তাঁদের সংগঠন রয়েছে, তেমনই রয়েছে কঠিন পরিস্থিতিতে দেশ শাসনের অভিজ্ঞতা।
তবে বহুদিন তারা ক্ষমতায় নেই এবং আওয়ামী লীগ আমলে যথেষ্ট কোণঠাসা হয়ে ১৫টা বছর কাটাতে হয়েছে। কিন্তু, আওয়ামী লীগ বিদায় হতেই বাংলাদেশ জুড়ে সর্বত্র বিএনপি (BNP)-র নেতাকর্মীরা নতুন প্রাণশক্তিতে পুরানো মূর্তি ধারণ করেছেন। তাছাড়া, দেশ শাসনের অভিজ্ঞতা থাকার দিক থেকে বিএনপি এবারের ভোটে বাকিদের থেকে অনেক বেশি ভরসাযোগ্য মনে হতে পারে।
এবার আসা যাক, জোটের কথায়। বিএনপি মানে কিন্তু কুড়ি দলের জোট। ২০ দলের জোট বলে আবার নির্বাচনী আসন সমঝোতা ভাববেন না। বরং এটি মতাদর্শগত জোট। বিএনপি এমনিতে একটি মধ্যপন্থী দল। আর বহু দিন ধরে শীত-গ্রীষ্ম্য-বর্ষা এই শরিক দলগুলিকে সঙ্গে নিয়েই রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে তারেক জিয়ার দল। তাই সমর্থনের বেসটা অনেক বেশি পোক্ত। মজার বিষয় হল, বিএনপি (BNP-র সঙ্গী দলগুলির মধ্যে কয়েকটিকে বাদ দিলে বাকিদের তেমন একটা মাঠে ময়দানে দেখতে পাওয়া যায় না। ফলে, আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে স্টিয়ারিং হুইলে সদাসর্বদা বিএনপি (BNP)-ই থাকে। ছিঁটেফোঁটা কয়েকটা আসন দেওয়া হয় শরিকদের। এবারেও সংখ্যাটা দেখলেই বুঝবেন- ৩০০টির মধ্যে ২৮৮টি আসনে নিজের প্রতীক মানে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছে রাতের জিয়ার দল। আর মাত্র ১২টি আসন তারা ছেড়েছেন ১৯টি শরিক দলের জন্য, তাহলেই বুঝুন। তার মানে, সর্বোচ্চ আসনে লড়বে BNP কিন্তু, সমর্থন জোগাড় করবে শরিক দলের ভোট বেসের বড় অংশের থেকে।
জুলাই-অগস্টে যেসব ছাত্রনেতারা সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন তাঁরা কেউ কেউ ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন আবার অনেকে সরকারে না থেকেও হাতে মাথা কাটতেন। পরে এরাই ন্যশনাল সিটিজেনশিপ পার্টি (NCP)- তৈরি করলেন। বিগত সতেরো মাসে এইসব নেতাদের অনেকেরই নানা কীর্তি সামনে এসেছে এবং তাঁদের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। এই সব নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত NCP-র সঙ্গে আসন সমঝোতায় যায়নি BNP। ফলে, BNP-র কাঁধে এবার ইসলামি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ম্যাসকট জামাতের বোঝাও যেমন নেই তেমনই নেই NCP-র বোঝা।
এছাড়া রয়েছে আওয়ামী ও সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ ভোট। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের অনেকেই এবার ভোট দেবেন না। আবার স্থানীয় চাপে অনেককে ভোট দিতেও হবে। এই ভোটটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে BNP-র ঝুলিতে ঢুকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, আওয়ামী লীগের কার্যকলাপে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে নৈতিক সমর্থন ছিল না BNP-র। তাছাড়া, BNP-র মতো মূল স্রোতের মধ্যপন্থী দল ক্ষমতায় এলে আওয়ামি লীগের প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ বাড়বে। একইভাবে, বিগত ১৭ মাসে বাংলাদেশে যেভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সংখ্যালঘুরা তাতে তাদেরও একটা অংশ ভোট দিতে যাবে না। আর যারা যাবেন, তাদের বেশিরভাগই BNP-কে ভোট দেবেন। কারণ, এবারের BNP কিন্তু আর জামাতের দোসর নয় বরং ঘোরতর প্রতিপক্ষ।
গোটা বাংলাদেশজুড়ে ইদানিং সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাওয়া বেশ গতি পেয়েছে। এই হাওয়াই এবারের ভোটে জামাত-সহ যাবতীয় ইসলামি দলগুলির জোটের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো BNP-র পাল থেকে কিছুটা হাওয়া কাড়তে পারে।
আওয়ামী লীগের পতন ঘটানোর পর থেকেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মহানগর – সর্বত্র বিভিন্ন স্তর থেকে অন্যায্যভাবে টাকা তোলা যাকে ওই দেশে চাঁদাবাজি বলা হয় সেই অভিযোগ উঠেছে BNP-র বিরুদ্ধে। ব্যাপারটা এতটাই অস্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দলের থেকে অনেককে তাড়ানোর দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হয়েছে তারেক রহমানকে। কিন্তু, তাতে যে তেমন কিছু লাভ হয়নি সেটাও সত্য। অনেকেই বলছে, ছোট নামদের ছাঁটা হয়েছে, চাঁদাবাজিতে যারা আসল পালের গোদা তারা এখনও BNP দফতরগুলো আলো করে বসে আছেন আজও।
এছাড়া, বড় দলের ভিতরে যা হয় তা BNP-তেও হচ্ছে। অর্থাৎ, গত ১৫ বছর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না পেয়ে নির্বাচনে অংশ না নিতে পেরে BNP-র ক্ষুধার্ত নেতারা অনেকেই টিকিট প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু, সবার ভাগ্যে তো আর সিঁকে ছেঁড়েনি। তাই তারা নির্দল মানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এবারের ভোটে লড়বেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই BNP প্রার্থীদের বিপদে ফেলবেন বলে মনে করা হচ্ছে। এই জল যে শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়াবে তা এখনই বলা মুশকিল।
এর বাইরে আরেকটা মহা বিপদ রয়েছে তারেক জিয়ার দলের। সেটা হল, অধিকাংশ BNP প্রার্থীরা আওয়ামী লীগহীন এবারের নির্বাচনে নিজেদের জয়ের ব্যাপারে এতটাই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছেন যে পর্যন্ত এই ওভার কনফিডেন্সই না কাল হয়ে দাঁড়ায়!