
অটোয়া-ওয়াশিংটন: রাশিয়া-ইউক্রেনের (Russia-Ukraine) মধ্যে এখনও যুদ্ধ চলছে। ইরান-আমেরিকার (Iran-America) মধ্যেও কোনও শান্তি সমঝোতা হয়নি। এই আবহে আরও একটা যুদ্ধের ইঙ্গিত? এবার আমেরিকা ও কানাডার (America-Canada) মধ্যেও যুদ্ধ? সম্প্রতি, একটি মন্তব্য করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি (Mark Carney)। তিনি বলেছেন, “যখন আপনার উপর হামলা হয়, তখন আপনি যুদ্ধে রয়েছেন। আর আমাদের উপর হামলা হয়েছে।” কে হামলা করেছে? উত্তর আমেরিকা। তবে, কোনও সশস্ত্র হামলা নয়। কানাডায় ৫০ শতাংশ শুল্কবাণ ছুড়েছে আমেরিকা। তারপর থেকেই আমেরিকাকে একের পর এক কড়া বার্তা দিচ্ছেন কার্নি। তাঁর দাবি, কানাডার সার্বভৌমত্ব এবং দেশের শিল্পক্ষেত্রের স্বার্থের সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ডলারে ডলারে হিসেবে নেবেন। পাল্টা আমেরিকার উপরও শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছেন।
কার্নি জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই পাল্টা শুল্ক কার্যকর হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আমেরিকা থেকে আমদানি করা দুগ্ধজাত পণ্য, ইস্পাত, গৃহস্থালির বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম, কৃষি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স এবং পাল্প ও কাগজ-সহ একাধিক পণ্যে পাল্টা শুল্ক চাপানো হবে। অন্যদিকে, শনিবার থেকেই কানাডার একাধিক পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে আমেরিকা। কানাডা থেকে আমেরিকায় বছরে যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়, তার প্রায় ৫ শতাংশ এই শুল্কের আওতায় পড়বে। এই তালিকায় রয়েছে হকি স্টিক থেকে শুরু করে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য।
মূলত আমেরিকা-কানাডা বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরই ঝামেলার সূত্রপাত। শনিবার ২২ মিনিটের ভাষণে কার্নি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন যদি কানাডার পণ্যের উপর শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে রাজি হত, তাহলে মার্কিন অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত এবং মোটরগাড়ির উপর বর্তমানে পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার করতে প্রস্তুত ছিল অটোয়া। এমনকি কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে ফের মার্কিন মদ বিক্রির ক্ষেত্রে উৎসাহ দিতেও প্রস্তুত ছিল সরকার।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ প্রস্তাব কানাডার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কার্নির কথায়,”ওরা অনেক বেশি চেয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে খুব কম দিতে চেয়েছে। ওরা যা প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা তা মেনে নিতে পারি না। আর ওরা যা চেয়েছে, সেটাও আমরা দিতে পারি না।” তাঁর দাবি, আমেরিকার শর্ত মেনে নিলে কানাডার সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করতে হত এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পক্ষেত্রগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হত।
আমেরিকার সঙ্গে কানাডার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন কার্নি। তিনি বলেন, “আমরা প্রথম থেকেই বুঝেছি যে আমেরিকা বদলে গিয়েছে। আমরা বুঝেছি, কখনও কখনও তাদের স্বাক্ষর পেনসিলে লেখা হয়।” একইসঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আমেরিকা-কানাডার সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফিরবে না। তাঁর কথায়,”আমরা আর পুরনো সম্পর্কে ফিরে যাচ্ছি না।”
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা চলছিল। এমনকি মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ওয়াশিংটনে তিনদিন ধরে কানাডার মার্কিন বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক এবং মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত কোনও সমাধানসূত্র বেরোয়নি। এরপরই আলোচনা স্থগিত করে কানাডার প্রতিনিধিদলকে অটোয়ায় ফিরে আসার নির্দেশ দেন কার্নি।
কার্নির দাবি, শেষ মুহূর্তে আমেরিকার তরফে প্রস্তাবে এমন কয়েকটি শর্ত যোগ করা হয়েছিল, যা কানাডার তৈরি গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় কমিয়ে দিত। পাশাপাশি অন্য দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্যচুক্তি করার কানাডার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে যেত। দেশের সার্বভৌমত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সুরক্ষাও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই ওই শর্তগুলি মানতে রাজি হয়নি অটোয়া।
যদিও কানাডার অভিযোগ মানতে নারাজ ট্রাম্প প্রশাসন। জেমিসন গ্রিয়ারের দাবি, কাঠ, ইস্পাত এবং গাড়ির মতো কানাডার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু কানাডাই সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় এবার আমেরিকা-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি বা USMCA-র ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আমেরিকার সঙ্গে এই বাণিজ্য যুদ্ধ কানাডার অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা সরকারের ‘স্টেট অব ট্রেড ২০২৬’ রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশটির মোট পণ্য রফতানির ৭০ শতাংশেরও বেশি যায় আমেরিকায়। অন্য কয়েকটি হিসাব অনুযায়ী, এই হার প্রায় ৭৭ শতাংশ। কানাডার পরিষেবা রফতানির অর্ধেকেরও বেশি যায় মার্কিন বাজারে।