
আবু ধাবি: হরমুজ প্রণালীর উপর থেকে নির্ভরতা কমাতে চাইছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলি (Gulf Nations)। ইরান-আমেরিকার (Iran-US Ceasefire) মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের পর থেকেই হরমুজে উত্তেজনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বারবার হামলার কারণে জাহাজে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পণ্যবাহী জাহাজ গেলেই দিতে হচ্ছে মোটা টাকার কর। অথচ পাঁচ মাস আগেও বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের পথ ছিল এই হরমুজ (Strait of Hormuz)। মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হত। অথচ এখন হরমুজে সেই ব্যস্ততা নেই। তেল সরবরাহ কমেছে। তার উপর মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ, গোলাগুলির শব্দ। প্রাণ হারাচ্ছেন নাবিকরা। বাদ যাচ্ছেন না ভারতীয়রাও। তাই এবার হরমুজের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প রুটের ভাবনা-চিন্তা করছে উপসাগরীয় অঞ্চলগুলি (Gulf Nations)। ইতিমধ্যে বিকল্প রুটের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলি এখন দ্রুত এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যাতে তেল রফতানির জন্য আর সম্পূর্ণভাবে হরমুজ় প্রণালীর উপর নির্ভর করতে না হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে হামলা, নৌ চলাচলে বিঘ্ন এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার পরই এই উদ্যোগ আরও জোরদার হয়েছে। মূল লক্ষ্য একটাই। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল পরিবহনের পথ হরমুজ় প্রণালীর উপর নির্ভরতা কমানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ইরানের প্রভাব সীমিত করা।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইরাক ইতিমধ্যেই এমন বৃহৎ পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে, যা হরমুজ় প্রণালী এড়িয়ে তেল পরিবহণে সাহায্য করবে। একই পথে হাঁটছে সৌদি আরবও। পাশাপাশি, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী নতুন একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, যাতে হরমুজ়ের উপর নির্ভরতা আরও কমে।
সংযুক্ত আরব-আমিরশাহীর ‘ওয়েস্ট-ইস্ট পাইপলাইন’ প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদের নির্দেশ , ২০২৭ সালের মধ্যেই এই প্রকল্প শেষ করতে হবে। ২৫২ মাইল দীর্ঘ এই পাইপলাইন চালু হলে ফুজাইরাহ পাইপলাইনের সমান্তরালে চলবে এবং স্থলপথে আরব আমিরশাহীর তেল রফতানির ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে প্রতিদিন ৩৬ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছবে।
ইরাক ৪৩৫ মাইল দীর্ঘ ‘বাসরা-হাদিথা’ পাইপলাইনের কাজ শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এটি জর্ডন, সিরিয়া এবং তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রতিদিন ২৫ লক্ষ ব্যারেল তেল পরিবহনেক ক্ষমতা থাকবে এই প্রকল্পের। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ শিয়া আল-সুদানি দেশের তেল রফতানিকে আঞ্চলিক অস্থিরতা থেকে সুরক্ষিত রাখার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন।
মে মাসে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রায় ১৫০ কোটি ডলার বরাদ্দ করা হলেও কবে কাজ শেষ হবে, তা এখনও জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, সৌদি আরবও ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ক্ষমতা প্রতিদিন ৯০ লক্ষ ব্যারেলে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
পাইপলাইনের পাশাপাশি আরব আমিরশাহী হরমুজ় প্রণালীর আরব সাগর সংলগ্ন অংশে একটি বড় বন্দর ও কন্টেনার টার্মিনাল তৈরির পরিকল্পনা করছে।এই বন্দর চালু হলে পণ্যবাহী জাহাজগুলি হরমুজ় এড়িয়েই উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবে। ভবিষ্যতে এটি দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের সঙ্গেও প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প রুটে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও হরমুজ় প্রণালীর গুরুত্ব পুরোপুরি কমবে না। এখনও প্রতিদিন আনুমানিক ৭০ থেকে ৯০ লক্ষ ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হবে। এছাড়া নতুন কিছু রুট আবার লোহিত সাগরের স্থিতিশীলতার উপর নির্ভরশীল। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলি ইরানের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করলেও, হরমুজ় প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এবং তেহরানের প্রভাব পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া সহজ হবে না।