
তেহরান: একটা যুদ্ধ, তার জেরে থমকে যেতে পারে গোটা বিশ্ব। আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ বাঁধলে বন্ধ হতে পারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট, হরমুজ প্রণালী। সেই আশঙ্কাই সত্যি হল। একযোগে ইরানের উপরে হামলা করেছে ইজরায়েল-আমেরিকা। তার প্রত্যাঘাতে আমেরিকার সাতটি বন্ধু দেশ- জর্ডন, কুয়েত, কাতার, বাহরিন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে মার্কিন ঘাঁটি থেকে শুরু করে হোটেল-বহুতল লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়েছে ইরান। এবার আরও বড় সিদ্ধান্ত। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করল ইরান।
ইরানের ইসলামিক রেভেলিউশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, কোনও জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে পারবে না। এর জেরে বিশ্ব বাজারে তেল লেনদেনে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা। কারণ মাত্র ৫০ কিলোমিটার চওড়া এই সরু খালের মতো পথ দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ তেলের আমদানি-রফতানিই এই রুটের মাধ্যমে হয়। বিশ্বে প্রতি পাঁচটি ব্যারেলের মধ্যে একটি ব্যারেল হরমুজ প্রণালীর মধ্যে দিয়ে আসে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, ইরান- তেলের ভাণ্ডারের উপরে অবস্থিত মধ্য প্রাচ্যের প্রায় সমস্ত দেশই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমেই তেল রফতানি করে। এই তেল আসে এশিয়ার বাজারে। মূলত ভারত, চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় তেল রফতানি করা হয়।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় চাপে পড়বে ভারতও, কারণ তাদের তেলের ভাণ্ডার প্রায় ফাঁকা। সূত্রের খবর, ভারতের কাছে যতটা তেলের রিজার্ভ আছে, তাতে ৭৪ দিনের জন্য অন্তর্দেশীয় চাহিদা মেটাতে পারবে। তারপর অন্য় কোথাও থেকে তেল জোগাড় করতে হবে। তেলের ভাঁড়ার শেষ হয়ে গেলে খরচ বাড়বে অনেকটাই। দাম বাড়বে পেট্রোল-ডিজেল থেকে শুরু করে সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের।
ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় ভারতকে বিকল্প খুঁজতে হবে তেলের জোগানের জন্য। তবে সরকারি সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই বিকল্প শক্তি ও জ্বালানির ব্যবস্থা ভেবে রেখেছে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি দুই মাসেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা ক্রুড তেল কেনা বাড়িয়েছে ভারত। গত বছর যেখানে ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনেছিল ভারত, সেখানেই ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি দিনে ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে। এই রুটে নির্ভরশীলতা বেড়েছে কারণ ভারত সম্প্রতিই রাশিয়ার থেকে তেল কেনা কমিয়ে, মধ্য প্রাচ্য থেকে তেল কেনা শুরু করেছিল।
কেপলারের (Kpler) ডেটা অনুযায়ী, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের মাসিক তেল আমদানির ৫০ শতাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে এসেছে। গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে যেখানে ৪০ শতাংশ তেল আমদানি করা হয়েছিল এই পথ ধরে। এবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় ভারত মধ্য প্রাচ্যেরই বিকল্প রুট বেছে নিতে পারে তেল আমদানির জন্য। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন (লোহিত সাগরে) এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আবু ধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন হরমুজের বিকল্প হিসাবে কাজ করে, তবে এর বেশ কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। তেল আমদানির পরিমাণও সীমিত।
সেক্ষেত্রে রাশিয়ার কাছেই আবার ফিরতে হতে পারে ভারতকে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও বাধা রয়েছে। আমেরিকা আগেই ভারতের উপরে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিল শুধুমাত্র রাশিয়া থেকে তেল কেনায়। বর্তমানে ভারত-আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। সেই পরিস্থিতিতে ভারত রাশিয়ার মুখাপেক্ষি হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
আমেরিকা চায় ভারত তাদের কাছ থেকে তেল কিনুক। এছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার নাইজেরিয়া, আঙ্গোলা থেকেও তেল আমদানি করতে পারে ভারত। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ভেনেজ়ুয়েলা থেকেও তেল কেনা যাবে, তবে এই বিকল্প ব্যবস্থায় ভারতের তেল আমদানির খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে, যার ফলে দেশের অন্দরে পেট্রোল-ডিজেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস-সব কিছুরই দাম বাড়বে অনেকটা।