
মালে: ভারত এবং মলদ্বীপের মধ্যে যদি যুদ্ধ হয়, তাহলে কী হবে? অতীতে কখনও ভারত মহাসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ বাঁধেনি ভারতের। বরং, ঐতিহাসিকভাবে বরাবর ভারত পাশে থেকেছে মলদ্বীপের। ১৯৮৮ সালে মলদ্বীপে সেনা অভ্যুত্থানের সময়ও মলদ্বীপে অপারেশন ক্যাকটাস পরিচালনা করেছিল ভারতীয় সেনা। পাশে ছিল মলদ্বীপ সরকারের। তাহলে কেন যুদ্ধের কথা আসছে? আসলে, পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে গত নভেম্বরে মলদ্বীপের ক্ষমতায় চিনপন্থী প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জু আসায়। ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারকে সামনে রেখেই ক্ষমতায় এসেছেন। আসার পর থেকে একের পর এক ভারত বিরোধী পদক্ষেপ করে চলেছেন। ভারতীয় সেনাকে মলদ্বীপ ছাড়ার জন্য ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছেন। মলদ্বীপকে ‘ভারতের প্রভাবমুক্ত’ করা লক্ষ্যে চিনকে আমন্ত্রণ করে আনছেন তিনি। তিনি আসার পর থেকে, প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে ভারত ও মলদ্বীপের কুটনৈতিক সম্পর্ক।
লাক্ষাদ্বীপ-মলদ্বীপ বিতর্কের প্রেক্ষিতে, মলদ্বীপের মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে প্রায় যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। একের পর এক উস্কানিমূলক মন্তব্য করা হয়েছে। এই অবস্থায় আসুন দেখে নেওয়া যাক, মলদ্বীপের সামরিক ক্ষমতা ঠিক কতটা। যদি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে, আদৌ কি ভারতকে একটুও ধাক্কা দিতে পারবে?
বছরের শুরুতেই বিভিন্ন দেশের সামরিক ক্ষমতার তুলনা করেছিল গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার সংস্থা। তাদের তৈরি তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে সামরিক ক্ষমতার নিরিখে গোটা বিশ্বের মধ্যে ভারত রয়েছে পঞ্চম স্থানে। মোট ১৪৫টি দেশের স্থান হয়েছে এই তালিকায়। শেষতম স্থানে রয়েছে ভুটান। মলদ্বীপের সামরিক ক্ষমতা এতটাই কম, যে এই ১৪৫টি দেশের মধ্যেও জায়গা হয়নি তাদের। কাজেই ধারে-ভারে ভারতের সামরিক ক্ষমতার সঙ্গে মলদ্বীপের কোনও তুলনাই চলে না। তাই বলে, মলদ্বীপের কোনও সামরিক বাহিনী নেই, এমন ভাবারও কারণ নেই। তাদের সামরিক বাহিনীকে বলা হয়, মলদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স। সেই দেশের সংবিধান তাদের প্রজাতন্ত্র, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং দেশের জনগণের সুরক্ষা দায়িত্ব এই বাহিনীর উপরই রয়েছে। এই বাহিনীর তিনটি শাখা হল মলদ্বীপ কোস্ট গার্ড, এমএনডিএফ মেরিন কর্পস এবং স্পেশাল ফোর্স।
নাম থেকেই স্পষ্ট, মলদ্বীপের কোস্ট গার্ড হল মলদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের নৌবাহিনী বা সামুদ্রিক শাখা। এর বাইরে আলাদাভাবে মলদ্বীপের কোনও নৌবাহিনী নেই। কোস্টগার্ডের বহরে রয়েছে তিনটি ‘ট্র্যাকার এমকে ২ ক্লাস’ টহলদারী নৌকা, ১টি ‘ট্র্যাকার ক্লাস’ টহলদারী নৌকা, ১টি ‘১৭ এম ক্লাস’ টহলদারী নৌকা, ১টি ড্যাগার ক্লাস টহলদারী নৌকা, ১টি শেভারটন ক্লাস টহলদারী নৌকা, ২টি ইজরায়েলি ডভোরা ক্লাস ফাস্ট টহলদারী নৌকা যাতে কিছু অদল বদল করে ২৪ এম – আল্ট্রা ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফটের মতো তৈরি করা হয়েছে, ১টি হ্যামিল্টন জেট মডেল এইচএম৪২২ ফাস্ট ল্যান্ডিং ক্রাফট, ১টি ১৭ এম ফায়ার রেসকিউ বোট তথা টহলদারী নৌকা, ১টি নিকোবর শ্রেণীর টহলদারী জাহাজ (এটি ভারতেরই উপহার দেওয়া, আগে নাম ছিল আইএনএস তারমুগলি), ১টি ৪২ এম টহলদারী নৌকা, ১টি ৩৫ এম টহলদারী নৌকা এবং বেশ কিছু রিজিট ইফ্লেটেবল বোট বা রাবারের ডিঙি।
এমএনডিএফ মেরিন কর্পস হল মালদ্বীপ জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর গ্রাউন্ড কমব্যাট ফোর্স। অর্থাৎ, যারা সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আগে, র্যাপিড রিঅ্যাকশন ফোর্স নামে পরিচিত ছিল এই বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যরা উচ্চ শারীরিক শক্তি সম্পন্ন হয় এবং তাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য। মেরিন কর্পসের মধ্যেই রয়েছে মেরিন ডেপ্লয়মেন্ট ইউনিট। দেশের প্রধান প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব থাকে এই বাহিনীর উপর। এছাড়া, তাদের কাজ হল, সামুদ্রিক অভিযানে কোস্ট গার্ডকে সহায়তা করা, কোনও সঙ্কটের সময় অসামরিক কর্তৃপক্ষকে সহায়তা প্রদান, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান, যুদ্ধ করা, বিদ্রোহ দমন করা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা। মলদ্বীপ মেরিন কর্পসকে অবশ্য যুদ্ধের থেকে বেশি মানবিক সহায়তা প্রদান এবং বিপর্যেয়র সময় ত্রাণ পরিচালনা করতেই দেখা গিয়েছে।
বিভিন্ন বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করার জন্য ব্যবহার করা হয় মলদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের স্পেশাল ফোর্সেস শাখাকে। বিভিন্ন ধরনের বিশেষ অভিযান চালাতে পারে এই বাহিনী। এর জন্য তাদের কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মলদ্বীপ জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন শাখার উজ্জ্বলতম সদস্যদের সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করে স্পেশাল ফোর্সের সদস্য করা হয়। ইউএস আর্মি স্পেশাল ফোর্স, ইউএস নেভি সিল, পাকিস্তানের স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ, ব্রিটিশ এসএএস, ভারতীয় সেনার প্যারা স্পেশাল ফোর্সেস এবং শ্রীলঙ্কার আর্মি কমান্ডোদের মতো বিশ্বের বিভিন্ন অভিজাত বাহিনীর সঙ্গে প্রায়শই প্রশিক্ষণ নেয় মলদ্বীপের এই বাহিনী। মলদ্বীপের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে অত্যন্ত গোপনে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এই বাহিনীর সদস্যদের।
তাদের হাতে বেশ কিছু উন্নতমানের আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে। যেমন, বেলজিয়ামের ব্রাউনিং হাই-পাওয়ার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এম১৯১১ পিস্তল, জার্মানির হেকলার অ্য়ান্ড কচ এমপি৫, মার্নি যুক্তরাষ্ট্রের এম৪ কার্বাইন, সুইডেনের কার্ল গুস্তাফ ৮.৪ সেমি রিকোয়েললেস রাইফেল, রাশিয়ার তৈরি আরপিজি-৭ এবং একে-১০৩, সুইজারল্যান্ডের এসআইজি সয়ের পি২২৬, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সিএমপি ৯, সিএসআর ৮১৭ এবং সিএসআর ৫০, রাশিয়ার একে-৪৭, পিকে মেশিনগান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এম২ ব্রাউনিং, বেলজিয়ামের এফেন এমএজি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারেট এমআরএডি, এম২৪ স্নাইপার, রাশিয়ার পিকেপি মেশিনগান ইত্য়াদি।
এই হল মলদ্বীপের সামরিক শক্তি। ভারতের সামরিক শক্তির সঙ্গে যে এর কোনও তুলনাই হয় না, তা বলাই বাহুল্য। তাহলে কীসের জোরে ভারতের চোখে চোখ রেখে কথা বলছে মলদ্বীপ? আসলে তাদের পিছনে রয়েছে চিনের সমর্থন। পাকিস্তানও মলদ্বীপের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে। তবে, ভারতের মতো বড় শক্তির সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার মতো নির্বুদ্ধিতা চিন বা পাকিস্তান করবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়।