
গালওয়ানের স্মৃতি ফিরল মাঝ-সমুদ্রে। দক্ষিণ চিন সাগরে ফিলিপিন্সের উপকূল রক্ষা বাহিনীর উপর অতর্কিতে হামলা চিনের নৌ-সেনার। গালওয়ানে সংঘর্ষ হয়েছিল পাহাড় ঘেরা পাথুরে জমিতে। দক্ষিণ চিন সাগরে বোটের উপর হল ধস্তাধস্তি। ফিলিপিন্সের অভিযোগ, ভারী ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের বোটে হামলা চালায় পিপলস লিবারেশন আর্মি। গালওয়ানে যেমনটা হয়েছিল, অবিকল সেইভাবেই। চিনা সেনার হামলায় ফিলিপিন্সের দুই সেনা আহতও হয়েছেন বলে খবর। একজনের আঙুল কাটা গিয়েছে। ফিলিপিন্স সেনাদের বন্দুক কেড়ে নিয়ে, মারধর করারও অভিযোগ উঠছে।
ফিলিপিইন্সের সেনাপ্রধান জেনারেল রোমিও ব্রাউন জুনিয়রের অভিযোগ, জলদস্যুদের থেকেও ঘৃণ্য হামলা চালিয়েছে চিন। এমনকি যাওয়ার সময় বন্দুক বোঝাই বাক্স ছিনতাই করে নিয়ে যায় লাল ফৌজ। ফিলিপিন্সের বোটগুলিকে বিকল করে দেওয়ার চেষ্টা হয়। ফিলিপিন্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, তাঁদের বোটে প্রায় ২৫ মিনিট ধরে তাণ্ডব চালায় চিনের সেনা। দক্ষিণ চিন সাগরের দক্ষিণে সেকেন্ড টমাস দ্বীপে এই ঘটনা। এই দ্বীপটি নিয়ে বহুদিন ধরে তিন দেশের ঝামেলা চলছে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্স – তিন দেশই সেকেন্ড টমাসকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। তিনটি দেশ এখানে পালা করে টহলও দেয়। এনিয়ে কোনও লিখিত চুক্তি নেই। তবে মৌখিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই এতদিন তিনটি দেশ পালা করে টহল দিত।
ফিলিপিন্স সেনার তরফে ঘটনার একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ চিন সাগরে ফিলিপিন্সের সেনা যে বোটের উপর দাঁড়িয়ে, তার একেবারে পাশে চলে আসে চিনের সেনা। ফিলিপিন্সের বোটগুলিকে ঘিরে ধাক্কা মারতে শুরু করে চিনারা। তারপর নিজেদের বোট ছেড়ে লাফিয়ে ফিলিপিন্সের বোটে উঠে পড়ে। ছুরি, তরোয়ালের মতো অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি দিতে শুরু করে। কথা-কাটাকাটি থেকে মারামারি শুরু হয়ে যায়।
দক্ষিণ চিন সাগরে এমন কিছু একটা যে ঘটতে পারে, তার আঁচ কিন্তু আগেই করছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ। গত কয়েকদিন ধরে দক্ষিণ চিন সাগরে টহলদারির মাত্রা বাড়াচ্ছিল পিএলএ। তাইওয়ানের সংবাদসংস্থার দাবি, দক্ষিণ চিন সাগরে এই মুহূর্তে সাড়ে পাঁচ হাজার চিনা ভেসেল রয়েছে। ১৫ জুন জল্পনা উস্কে একটি বিবৃতি জারি করে চিন। সেখানে বলা হয়, দক্ষিণ চিন সাগরের ৯০ শতাংশ অংশ চিনের। চিনের জলসীমায় অন্য কারও দাবি বা অধিকার থাকতে পারে না। এনিয়ে চিন কোনও আলোচনাতেও যাবে না।
এদিকে দক্ষিণ চিন সাগরের চারটি অংশ নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। চিন বাদে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ছাড়াও লাওস, কম্বোডিয়াও এই জলসীমাকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। অথচ চিন নিজের বাদে চিন সাগরে আর কাউকে পা রাখতে দিতে নারাজ। আর তাই ফিলিপিন্সের উপর চিনা হামলার কারণটা বুঝতেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন একটাই উদ্দেশ্য – নিজের জোর দেখানো। ভয় দেখানো। ছোট দেশগুলিকে ভয় পাইয়ে দেওয়া। ফিলিপিন্স সেনার মুখপাত্র মেনে নিচ্ছেন, মারমুখী চিনা সেনার হামলায় কার্যত প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরতে হয় উপকূলরক্ষী বাহিনীকে। তিনি বলেছেন, “চিনারা বিপজ্জনক অস্ত্র নিয়ে অতর্কিতে হামলা চালায়। আমরা স্রেফ টহল দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। লড়াইয়ের জন্য তৈরিই ছিলাম না।” ওই সেনা আধিকারিকের বক্তব্য, ভারত গালওয়ানের চিনকে পাল্টা মার দিয়েছিল। আমরা পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। তবে এবার থেকে আমরাও যে কোনও অবস্থার জন্য তৈরি থাকব। এদিনের হামলার পরপরই জলসীমায় ব্রহ্মস মোতায়েনের তোড়জোড় শুরু করেছে ফিলিপিন্স। কয়েক সপ্তাহ আগেই ভারত থেকে ব্রহ্মস হাতে পেয়েছে তাঁরা। এখন চিনের দখলদারির আশঙ্কায় সেই ব্রহ্মসই তাঁদের ভরসা।