Mohan bhagwat: ‘হিন্দু হল সাংস্কৃতিক পরিচয়, জীবনকে বোঝার পথ’, RSS-র আগামী ১০০ বছরের প্ল্যান বলে দিলেন মোহন ভাগবত

RSS chief Mohan Bhagwat: ভারতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ হিন্দুদের ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য রাখেন মোহন ভাগবত। তিনি বলেন, "তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবনযাপন করতে হবে। সেবার ক্ষেত্রেও একই মনোভাব থাকা প্রয়োজন। সেবা কখনও নিজের কৃতিত্ব দেখানোর বিষয় নয়। কাউকে সাহায্য করে তাঁর উপর উপকার করা হচ্ছে—এমন ভাবনাও থাকা উচিত নয়।"

Mohan bhagwat: ‘হিন্দু হল সাংস্কৃতিক পরিচয়, জীবনকে বোঝার পথ’, RSS-র আগামী ১০০ বছরের প্ল্যান বলে দিলেন মোহন ভাগবত
আরএসএস সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। Image Credit source: PTI

|

Sep 07, 2026 | 9:11 AM

লন্ডন: রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তাদের শতবর্ষে দেশের গণ্ডি পার করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গিয়েছে। লন্ডনে বসে শুধু দেশবাসী নয়, বিশ্ববাসীকে একতার পাঠ দিলেন আরএসএসের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। তিনি বলেন,  “বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ ও সমাজের মধ্যে নানা ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে। তবে যা মানুষকে এক করে, তার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাহলে সমাজ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং পৃথিবীও আরও ভালো জায়গায় পরিণত হবে।”

‘Celebration of Oneness’ নামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আরএসএস-এর ১০০ বছরের যাত্রা, হিন্দু সভ্যতা, সেবা, যুবসমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।

‘হিন্দুরা বিশ্বকে ভারসাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে’

আরএসএস-এর ১০০ বছরের যাত্রায় কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে মোহন ভাগবত বলেন, ‘আপনাপন’, অর্থাৎ সবার প্রতি শুদ্ধ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই সংঘের অন্যতম মূল ভাবনা।তাঁর বক্তব্য, “একজন ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায় এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি ভালোবাসা হিন্দুদের ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। হিন্দুরা বিশ্বকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।”

‘যেখানে কেউ কিছু করছে না, সেখানে সংঘ সেবা করছে’-

আরএসএস-এর সেবামূলক কাজ নিয়ে বলতে গিয়ে মোহন ভাগবত জানান, সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বয়ংসেবকরা কাজ করছেন। বলেন, “যেখানে কেউ কিছু করছে না, সেখানে সংঘ সেবা করছে—লাদাখ থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত”। তাই তাঁদের কাজের সম্পূর্ণ পরিধি কয়েকটি কথায় তুলে ধরা কঠিন।

তিনি বলেন,  “রাজনৈতিক কারণে যারা আরএসএসের বিরোধিতা করেন, তারাও সংগঠনের কাজ এবং স্বয়ংসেবকদের গুণের স্বীকার করেন। প্রয়োজনের সময়ে তাঁরাও আরএসএস-এর সহযোগিতা চান এবং সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেন।”

আগামী ১০০ বছরে কী করবে RSS?

আগামী ১০০ বছরের জন্য আরএসএস (RSS)-এর কী লক্ষ্য হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নের উত্তরে মোহন ভাগবত বলেন, গত ১০০ বছরে যে কাজ শুরু হয়েছে, তা আগামিদিনেও চালিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, “ইতিমধ্যেই তিন প্রজন্ম সংঘের কাজে যুক্ত। আরও দুই প্রজন্ম এখন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সপ্তম প্রজন্মের আগে হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করার কাজ সম্পূর্ণ হওয়া উচিত।”

বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য, এটাই হিন্দু ধারণা-

হিন্দু সভ্যতা বিশ্বের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, সেই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় মোহন ভাগবত বলেন, “হিন্দু চিন্তার মূল ভিত্তি হল—অস্তিত্ব আসলে এক, যদিও তা বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়।”

তাঁর কথায়, “বৈচিত্র্য মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তাই বৈচিত্র্যকে গ্রহণ এবং সম্মান করতে হবে। তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই বৈচিত্র্য আসলে একতারই বিভিন্ন প্রকাশ।”

‘হিন্দু’ শব্দটির অর্থ শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতি বা জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, হিন্দু একটি মানসিকতা ও প্রকৃতি, যেখানে সব ধরনের বৈচিত্র্যকে গ্রহণ ও সম্মান করার কথা বলা হয়।

‘হিন্দু রাষ্ট্র’ এবং ‘হিন্দুত্ব’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হিন্দু কোনও একটি ধর্মের নাম নয়। বিভিন্ন দর্শন ও আচার-অনুষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও একাধিক ধর্ম বৃহত্তর হিন্দু সভ্যতার কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারে।”

তরুণ প্রজন্মের উপর বেশি আস্থা-

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়েও আশাবাদী মোহন ভাগবত। তাঁর মতে, তরুণদের মধ্যে পৃথিবীকে আরও ভালো করে তোলার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। সেই লক্ষ্য পূরণে তাঁরা ছোটখাটো বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতেও প্রস্তুত।

তিনি বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কারণে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে যায়। কিন্তু তরুণরা যদি কোনও বিষয়কে সঠিক বলে মনে করে, তাহলে তাঁরা অনেক সময় পরিণতির কথা না ভেবেই সেটি গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দেন। তাই প্রবীণদের উচিত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান দেওয়া, কিন্তু তাঁদের উপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেওয়া। বরং তরুণদের নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত”।

ভারতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ হিন্দুদের ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য রাখেন মোহন ভাগবত। তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবনযাপন করতে হবে। সেবার ক্ষেত্রেও একই মনোভাব থাকা প্রয়োজন। সেবা কখনও নিজের কৃতিত্ব দেখানোর বিষয় নয়। কাউকে সাহায্য করে তাঁর উপর উপকার করা হচ্ছে—এমন ভাবনাও থাকা উচিত নয়।”

বরং তাঁর বক্তব্য, “সেবা হল ঈশ্বরের আরও কাছে যাওয়ার একটি সুযোগ। যাঁরা সেবা গ্রহণ করছেন, তাঁরা সেবা করার সুযোগ দিয়ে আসলে সেবাদানকারী ব্যক্তিকেই উপকৃত করছেন। তাই নিঃস্বার্থ মনোভাব নিয়েই সেবা করা উচিত।”

ব্রিটেনে বসবাসকারী হিন্দুরা যখন ভারতের কথা বলেন, তখন তাঁদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই প্রসঙ্গে RSS-এর প্রধান বলেন, ব্রিটেন এবং ভারতের প্রতি আনুগত্যের মধ্যে কোনও সংঘাত থাকা উচিত নয়।  ব্রিটিশ হিন্দুরা যদি সত্যিকারের হিন্দু মূল্যবোধ অনুসরণ করেন, তাহলে ব্রিটেন ও ভারতের স্বার্থের মধ্যে সংঘাত তৈরি হওয়ার কথা নয়। তবে কখনও যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তাঁরা যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশের প্রতিই তাঁদের দায়িত্ব ও আনুগত্য থাকবে।

তাঁর ব্যাখ্যায়, কর্মভূমি হল সেই জায়গা যেখানে একজন মানুষের আনুগত্য ও দায়িত্ব রয়েছে। জন্মভূমি বা পূর্বপুরুষের ভূমি এবং পুণ্যভূমি থেকে যে মূল্যবোধ পাওয়া যায়, সেই মূল্যবোধ কর্মভূমিতে প্রয়োগ করাই কর্তব্য।

‘বিভেদের বদলে যা এক করে, তার উপর জোর দিন’

হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ নয়—এমন ধারণা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মোহন ভাগবত বলেন, সমাজে বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বিভেদের জায়গাগুলিকে সামনে না এনে মানুষকে যে বিষয়গুলি এক করে, তার উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তাঁর কথায়, “আমাদের যা এক করে, তার উপর জোর দিতে হবে, যা বিভক্ত করে তার উপর নয়।  এমনভাবে এগোতে পারলে সম্প্রদায় ও সমাজ আরও উন্নতি করবে এবং শেষ পর্যন্ত গোটা বিশ্বই আরও ভালো জায়গায় পরিণত হবে।”

লন্ডনের এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন ব্রিটেনে বসবাসকারী ওয়েলনেস বিশেষজ্ঞ মমতা সুব্রাহ্মণ্যম। হিন্দু স্বয়ং সেবক সংঘ (indu Swayamsevak Sangh)-এর উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় ৬০০ জন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ব্রিটেনের ৩২৬টি সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করেন।

অনুষ্ঠানে হাউস অফ লর্ডসের সদস্য, হাউস অফ কমন্সের সাংসদ, মেয়র, কাউন্সিলর এবং ব্রিটেনে ভারতের হাই কমিশনার পেরিয়াসামি কুমারন, ডেপুটি হাই কমিশনার কার্তিক পান্ডে-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

নেপালে বন্যায় মৃতদের স্মরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নেপালের ত্রাণের জন্য সেবা ইউকে (Sewa UK)-এর মাধ্যমে ১ লক্ষ পাউন্ড অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছে।

RSS-এর শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবেই মোহন ভাগবতের এই ব্রিটেন সফর। এই সফরে তিনি সেবা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং অভিন্ন মূল্যবোধ নিয়ে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলোচনা করেন। লন্ডনে থাকাকালীন তিনি ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রীতির বার্তা দিতে তিনি শ্রী স্বামীনারায়ণ মন্দির এবং খালসা জাঠা ব্রিটিশ আইলস গুরুদ্বার-সহ একাধিক ধর্মীয় স্থানেও যান। অনুষ্ঠানে ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রান্তের ৩১০টিরও বেশি সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us