
কাঠমাণ্ডু: কথায় আছে, রাখে হরি, মারে কে? আরও একবার তা প্রমাণ হয়ে গেল। টানা ৯ দিন, প্রায় ২১৬ ঘণ্টা। ছিল না কোনও খাবার, ছিল না জল। আলো-বাতাসহীন অন্ধকারে ডুবে থাকা সুড়ঙ্গের মধ্যে বারবারই হয়তো মনে হয়েছে যে কোনও মুহূর্তে মৃত্যু ছুঁয়ে ফেলবে ওঁদের। কিন্তু, বাঁচার অদম্য ইচ্ছেই হয়তো জীবনের আলোটাকে নিভে যেতে দেয়নি। কাদা-মাটির স্তূপ সরিয়ে যখন শুধুই মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে, ঠিক সেইসময় ওই স্তূপে প্রাণের খোঁজ পাওয়া মিরাকলের থেকে কম কিছু নয়। নেপালে (Nepal Flood) ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের পর থেকে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। দুই শ্রমিকের পাশাপাশি গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ বছরের এক শিশু-সহ তিন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে, ধ্বংসস্তূপের নীচে বহু প্রাণের খোঁজ পাওয়ার আশায় জোরকদমে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। আর এই উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ (Nepal Engineers Whatsapp Group)।
৫০০-রও বেশি ইঞ্জিনিয়র এবং জলবিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটি তৈরি করা হয়েছে। ত্রিশূলী উপত্যকায় ভয়াবহ হরপা বানের পর ইঞ্জিনিয়ররা এই গ্রুপটি তৈরি করেছিলেন। বিপর্যয়ের পর সেটিই এখন উদ্ধারকারীদের জন্য ‘রিয়েল-টাইম টেকনিক্যাল সাপোর্ট নেটওয়ার্ক’-এ পরিণত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর এবং ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গে পৌঁছতে উদ্ধারকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিচ্ছেন এই গ্রুপের সদস্যরা।
প্রশাসনের ধারণা, ক্ষতিগ্রস্ত উপত্যকার ছ’টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিখোঁজ প্রায় ৯০০ মানুষ বন্যার সময় সুড়ঙ্গের ভিতরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অথবা জল, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত আছড়ে পড়ার সময় সেখানে আটকে গিয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্তত তিনটির নির্মাণকাজ চলছিল। এই সুড়ঙ্গগুলি কোথায়, কী অবস্থায় রয়েছে, এই বিষয়ে জানতে সাহায্য করছে ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।
দ্য কাঠমাণ্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কীভাবে এই গ্রুপটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার একটি উদাহরণ সামনে এসেছে। সম্প্রতি, এক সরকারি আধিকারিক চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের লেআউট ড্রয়িং চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা পাঠান। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক ইঞ্জিনিয়র সেই নকশা শেয়ার করেন। তাতে পাওয়ারহাউজ় এবং প্রবেশের সুড়ঙ্গগুলির অবস্থান দেখানো ছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তথ্যের সাহায্যে কোথায় খনন করতে হবে এবং কীভাবে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া প্রকল্পটির কাছে পৌঁছনো যেতে পারে, তা নির্ধারণ করতে সুবিধা হয় উদ্ধারকারীদের।
বিপর্যয়ের পর গ্রুপটির পরিধি আরও বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির নকশা এবং পরিচালনা সম্পর্কে জানেন এমন আরও ইঞ্জিনিয়র ও বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের পথ সম্পর্কে জানেন এমন প্রাক্তন কর্মীদের কাছ থেকেও সাহায্য চেয়েছেন উদ্ধারকারীরা। বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শেয়ার করা প্রযুক্তিগত নকশাগুলি উদ্ধারকাজে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে।
বন্যার জেরে গোটা ত্রিশূলী উপত্যকায় আনুমানিক ২২ লক্ষ টন কাদা এবং ধ্বংসাবশেষ জমেছে। ফলে সুড়ঙ্গগুলির প্রবেশপথ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় বিপর্যয়ের জেরে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের কাঠামো বদলে গিয়েছে অথবা সুড়ঙ্গগুলি আংশিকভাবে ধ্বংসাবশেষে ভরে গিয়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন নেপাল সেনার মুখপাত্র রাজা রাম বসনেট।
রাসুওয়াগাধি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উদ্ধারকারীরা একটি সুড়ঙ্গের প্রায় ২৫০ মিটার ভিতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। কিন্তু তারপরই বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। আধিকারিকদের ধারণা, একটি চেম্বারের ভিতরে ৪৬ জন পর্যন্ত আটকে থাকতে পারেন। সেখানে তাঁদের কাছে খাবার এবং জল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। উদ্ধারকারী দল ফের সেখানে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শুক্রবার উদ্ধার অভিযানে বড় সাফল্য আসে। বিপর্যয়ের ন’দিন পর আপার ত্রিশূলী ত্রি এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একটি সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন হলেন মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ এবং মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবীর মহার্জন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলিতে চলা উদ্ধার অভিযানে এটিই ছিল প্রথম বড় সাফল্য। তাঁদের জীবিত উদ্ধারের পর সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও মানুষ বেঁচে থাকার আশা আলো জোগাচ্ছে।
বিপর্যস্ত নেপালে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ যে উপত্যকার উপর দিয়ে ভয়াবহ বন্যা বয়ে গিয়েছে, সেটি সাম্প্রতিক সময়ে নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে ছ’টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে তল্লাশি চালাচ্ছে উদ্ধারকারী দল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের জেরে নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
বিধ্বস্ত উপত্যকার উপর দিয়ে হেলিকপ্টারে নজরদারি চলছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে চলেছেন। আর এই উদ্ধার অভিযানে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারদের এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। ধ্বংসস্তূপের নীচে কী রয়েছে, সেই বিষয়ে যাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান রয়েছে, তাঁদের তথ্য উদ্ধারকারীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এই গ্রুপের মাধ্যমে।