
আপনারাও একথা শুনেছেন নিশ্চয়, যে ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু বিমান, জাহাজ বা সেনায় সেনায় হবে না। হবে ভাইরাস যুদ্ধ, সাইবার হামলা এমনকী মহাকাশ থেকেও। কীভাবে মহাকাশ থেকে মাটিতে যুদ্ধ পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে চিন, রাশিয়ার মতো দেশ। পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে আমেরিকাও। এবার মহাকাশ থেকে শত্রুর যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের উপর নজরদারি চালাতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ট্রাম্পের। মার্কিন মহাকাশ বাহিনী ‘ইউএস স্পেস ফোর্স’ এবার ইলন মাস্কের সংস্থা ‘স্পেস এক্স’-এর সঙ্গে প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এক বিশাল চুক্তি স্বাক্ষর করল। লক্ষ্য, আগামী বছরের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে আকাশপথে নজরদারি। যাতে আমেরিকার দিকে ধেয়ে আসা যে কোনও বিপদকে আগাম ট্র্যাক করা যায়।
শুনতে সায়েন্স ফিকশনের মতো লাগলেও এটাই ভবিষ্যত। মহাকাশ থেকে নজরদারি। যুদ্ধ পরিচালনার সামর্থ্য। যে যত আধুনিক স্যাটেলাইট পাঠিয়ে নজরদারি করবে, সে ততই যুদ্ধে এগিয়ে থাকবে। পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে শত্রুর বিমান, ড্রোন, মিসাইলের উপর নজরদারি চালাবে আমেরিকা। এই প্রযুক্তির পোশাকি নাম এয়ার মুভিং টার্গেট ইন্ডিকেটর বা AMTI। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হল মার্কিন সেনা ও ইলন মাস্কের স্পেস একসের মধ্যে। পেন্টাগনের প্ল্যান, দ্রুতই মহাশূন্যে স্যাটেলাইটের বিস্তারিত জাল বা নেটওয়ার্ক বিছানো। যার মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বিমান বা ড্রোনের গতিবিধি নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করা যাবে।
তাহলে কি এতদিন মার্কিন সেনা আকাশে কোনও মুভিং টার্গেটকে ট্র্যাক করতে পারত না?
পারত।
কিন্তু এতদিন ধরে আকাশপথে নজরদারির জন্য মূলত ‘আর্লি ওয়ার্নিং এয়ারক্রাফট’ বা ‘AWACS’ বিমানের ওপর নির্ভর করতে হতো মার্কিন বাহিনীকে। কিন্তু নতুন এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক চালু হলে মহাশূন্য থেকেই গ্লোবাল স্কাই সার্ভেইলেন্স চালানো যাবে। মোদ্দা কথা, আকাশপথে পাহারা দেওয়া যাবে। ফলে ব্যয়বহুল নজরদারি বিমানগুলির প্রয়োজনীয়তা শেষ হচ্ছে। বিপুল অর্থ বাঁচবে ট্রাম্পের কোষাগারে। ২০২৭ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণ করতে চায় মার্কিন মহাকাশ বাহিনী। মহাশূন্যে স্যাটেলাইটের জাল বা নেটওয়ার্ক স্থাপন সম্ভব হলে বাস্তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আর কোনও ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা অজানা বলে কিছুই থাকবে না। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্ত থেকে আমেরিকার দিকে মিসাইল দাগলেই তা আগাম ধরা পড়বে পেন্টাগনের কন্ট্রোল রুমে।
ভুলে চলবে না, চিন ও রাশিয়া ইতিমধ্যেই হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল ও স্টেলথ এয়ারক্রাফট বানিয়ে ফেলেছে। ওই সব অস্ত্র মাটির খুব কাছাকাছি উড়তে পারে, ফলে যত আধুনিক রেডার-ই হোক না কেন, ধরা পড়ে না। এখন মার্কিন সেনা মহাকাশে যে স্যাটেলাইট জাল বানাচ্ছে, তার ফলে মহাকাশ থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, কে কোন পথে হামলা চালাচ্ছে? এমনকী, চিন বা রাশিয়া যদি কোনও হাইপারসনিক মিসাইল হামলা করে, তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জানতে পারবে পেন্টাগন। সেই মতো পাল্টা প্রস্তুতি নিতে পারবে। সঙ্গে সঙ্গে সেনার সদর দপ্তরে নির্দেশ পাঠিয়ে মার্কিন ইন্টারসেপ্টর চালু করা হবে। রাশিয়া তাদের সেনা বহর আর্কটিক ফ্ল্যাঙ্কে বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে চিন উত্তরে মহাসাগরে বাড়তি নৌসেনা মোতায়েন করেছে। ট্রাম্প চাইছেন না, এই অবস্থায় মার্কিন সেনার কোনও ব্লাইন্ড স্পট থাকুক। বিশেষত পোলার রিজিয়নে। তাই তড়িঘড়ি ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টকে ৭.১ বিলিয়ন ডলারের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে AMTI তৈরিতে। এখন এই নতুন মহাকাশ দৌড় আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।