
মাদ্রিদ: অনুপ্রবেশকারীদের ঢল। মরক্কো থেকে শয়ে শয়ে মানুষ ঢুকে পড়ছেন স্পেনে। সীমান্ত টপকে নয়, সমুদ্র সাঁতরে তারা স্পেনে ঢুকে পড়ছেন। স্পেনের স্বশাসিত অঞ্চল সেউটা (Ceuta)-তে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেউটার আঞ্চলিক প্রধান হুয়ান জেসুস ভিভাস। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী বা অনুপ্রবেশকারী মরক্কো থেকে সেউটায় প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। বৃহস্পতিবার থেকে সীমান্তে উত্তেজনা চরমে ওঠে। নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের একাধিকবার সংঘর্ষও হয়।
সিভিল গার্ড কর্মী সংগঠনের প্রধান রাচিদ সবিহি জানিয়েছেন, মৃতদের মধ্যে অনেকেই সমুদ্রে ডুবে মারা গিয়েছেন। আবার অনেকে তারাজাল (Tarajal) সমুদ্রসৈকতের কাছে সীমান্তের বেড়া টপকে ঢোকার সময় পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
সেউটা সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, এই ঘটনা স্পেনের সার্বভৌম সীমান্ত লঙ্ঘনের সমান। অভিযোগ, মানব পাচারকারীরা তরুণদের ভুল পথে প্ররোচিত করছে। তাঁদের প্রলোভনের কারণেই বহু মানুষ সমুদ্রে বা সীমান্তে প্রাণ হারাচ্ছেন।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে সেউটায় প্রবেশ করেছিলেন। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৮,৩০০ জন ইতিমধ্যেই মরক্কোয় ফিরে গিয়েছেন। আরও অনেকে ধাপে ধাপে ফিরে যাচ্ছেন। প্রশাসনের তরফে সীমান্তে ফেরার ভিডিয়োও প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন সরকার অতিরিক্ত সেনা, পুলিশ, ডুবুরি দল, ড্রোন ও নৌযান মোতায়েন করেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একাধিক ভিডিওতে হাজার হাজার মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে সেউটায় ঢুকতে দেখা যায়।
মরক্কো থেকে স্পেনে আসা অভিবাসী বা অনুপ্রবেশকারীদের মূল লক্ষ্য হল উন্নত জীবন, কাজের সুযোগ এবং ইউরোপে প্রবেশ। স্পেনের সেউটা (Ceuta) ও মেলিলা (Melilla) উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত হলেও, এগুলি স্পেনের অংশ, অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ভূখণ্ড। তাই এই দুটি অঞ্চল ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
এর পিছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে—
কাজ ও ভালো আয়ের আশা: মরক্কো ছাড়াও সাহারার অন্তর্গত আফ্রিকার বহু দেশ থেকে মানুষ স্পেনে আসতে চান। তাদের আশা থাকে যে ইউরোপে কাজ পেলে, পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে পারবেন।
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব: আফ্রিকার অনেক দেশে কর্মসংস্থানের অভাব, কম আয় এবং জীবনযাত্রার কষ্ট মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: সুদান, মালি, নাইজারসহ বিভিন্ন দেশে সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ইউরোপমুখী হন।
ইউরোপে পৌঁছানোর সহজ পথ: সেউটা ও মেলিলা মরক্কোর সীমান্তেই অবস্থিত। তাই সমুদ্র পেরিয়ে বা সীমান্তের বেড়া টপকে এই দুই এলাকায় ঢোকার চেষ্টা অনেকেই করেন।
মানবপাচার চক্রের প্ররোচনা: পাচারকারীরা ইউরোপে সহজে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অর্থ নেয়। তাদের প্ররোচনায় অনেক মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এর ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক সময়ে একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষ সীমান্তে জড়ো হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ধাক্কাধাক্কি, পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা এবং সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরস্থিতি মোকাবিলা করতে স্পেন অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করেছে।
এই ব্যাপক অভিবাসন ঘিরে স্পেনের ওপর কূটনৈতিক চাপও বেড়েছে। জার্মানি, ইটালি ও ফিনল্যান্ড এই ঘটনার সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স স্পেনের সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি আরও কড়া করেছে।
ইউরোপীয়ান কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন সামাজমাধ্যমে লিখেছেন, “সেউটার পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না”। তাঁর কথায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম না মেনে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, সেউটা থেকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশকারীদের যাওয়ার কোনও বড় প্রবণতা এখনও দেখা যায়নি।
এদিকে, ইটালি স্পেনকে শেঙ্গেন (Schengen) মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সরানোর দাবি তুলেছে। ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কও সেই দাবিকে সমর্থন করেছে। ফ্রান্স ও ব্রিটেন স্পেনকে এই সঙ্কট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, ভবিষ্যতে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফক্স নিউজকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “এই ছবিটা মনে রাখুন। ভুল পক্ষ ক্ষমতায় এলে তিন বছরের মধ্যে আমেরিকাতেও এমন দৃশ্য দেখা যেতে পারে।”