
নয়া দিল্লি ও ওয়াশিংটন: ট্রাম্পের (Donald Trump) দল নির্বাচনে হারতেই ধসে গিয়েছে মার্কিন শেয়ার বাজার (America Share Market)। শুক্রবার যখন ওয়াল স্ট্রিটে রেকর্ড পতন দেখা যাচ্ছে সেইসময় সম্পূর্ণ উল্টো ছবি ভারতের শেয়ার বাজারে। আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটে গত ১৯ মাসের মধ্যে একদিনে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে শুক্রবার। ধস নেমেছে এশিয়ার একাধিক বাজারেও। দিনের শুরুতে ভারতীয় শেয়ার বাজারের (Indian Share Market) সূচকও নিম্নমুখীই ছিল। কিন্তু দিনের শেষে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। শুক্রবার বাজার বন্ধের সময় সেনসেক্স এক ধাক্কায় ১,৬০০ পয়েন্টেরও বেশি বেড়ে পৌঁছয় ৮১,০২৮-এ। অন্যদিকে, নিফটি ৫০ ছুঁয়ে ফেলে ২৫ হাজারের গণ্ডি।
শেয়ার বাজারের এই ঊর্ধ্বগতির জেরে একদিনের লেনদেনেই ভারতীয় শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের সম্পদ বাড়ল প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা। প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে যখন পতনের ঝড়, তখন ভারতের বাজারে এমন উত্থান কেন? এর পিছনে রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাবর্তন, অপরিশোধিত তেলের দাম কমা, বিভিন্ন সংস্থার ভালো আর্থিক ফল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-নির্ভর ব্যবসায় ভারতের তুলনামূলক কম প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের মতো একাধিক কারণ।
বিশ্বের শেয়ার বাজারে সাম্প্রতিক পতনের অন্যতম বড় কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-নির্ভর ব্যবসা নিয়ে উদ্বেগ। আমেরিকার AI শিল্পের বিপুল বিনিয়োগ নির্ভর করে চিপ, সার্ভার, বিদ্যুৎ এবং ডেটা সেন্টারের উপর। এই পরিকাঠামো তৈরির গতি কমে গেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ব্যবসায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। সেই আশঙ্কাতেই ব্যাপক শেয়ার বিক্রি শুরু করেন বিনিয়োগকারীরা। ন্যাসডাকে গত ১৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় একদিনের পতন হয়েছে। ন্যাসডাক ১০০-এর বাজার মূলধন থেকে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার চলে গিয়েছে বলে অনুমান।
তবে, ভারতের বাজারের ক্ষেত্রে এআই পরিকাঠামো সংস্থাগুলির প্রত্যক্ষ প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। উল্টে ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। ব্যয়বহুল এআই নির্ভর সংস্থার পরিবর্তে প্রচলিত আইটি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলিকে বিকল্প বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন অনেকে। যদিও এআই ভবিষ্যতে এই সংস্থাগুলির ব্যবসায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভারতীয় শেয়ার বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম বড় কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের (FII) প্রত্যাবর্তন। গত কয়েক মাস ধরে ভারতীয় শেয়ার বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেভাবে বিনিয়োগ করছিলেন না। কিন্তু এবার সেই প্রবণতায় বদল এসেছে।
জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভারতের শেয়ার বাজারে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। গত প্রায় ছয় বছরের মধ্যে একদিনে তাঁদের এটাই সর্বোচ্চ নিট কেনাকাটা বলে জানা গিয়েছে। চলতি সপ্তাহেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
ভারতের শেয়ার বাজারের জন্য অপরিশোধিত তেলের দাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি খরচ বাড়ে। তার প্রভাব পড়ে মূল্যবৃদ্ধি এবং টাকার দামের উপরেও। চলতি বছরে তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ ছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
কিন্তু সম্প্রতি ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের নীচে নেমেছিল অপরিশোধিত তেলের দাম। তাতেই বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। যদিও শুক্রবার আবার ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে গিয়েছে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম। ফলে তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
বাজারের উত্থানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বিভিন্ন সংস্থার ভালো আর্থিক ফলাফল। শুক্রবার মহিন্দ্রা অ্যান্ড মহিন্দ্রার শেয়ারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। সংস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সমন্বিত মুনাফা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি টাইটান, ইনফোসিস, টিসিএস, এইচসিএল টেকনোলজিস এবং ভারতী এয়ারটেলের শেয়ারেও উত্থান দেখা গিয়েছে।
তবে সেনসেক্স ও নিফটির এই উত্থান যে বাজারের সব অংশে সমানভাবে দেখা যাচ্ছে, তা নয়। বড় সংস্থার শেয়ারে কেনাকাটা বাড়লেও মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ সূচক সেই তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। শুক্রবার নিফটি স্মলক্যাপ ২৫০ এবং নিফটি মিডক্যাপ ১০০ সূচকে পতন দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, বিনিয়োগকারীরা আপাতত বেছে বেছে বড় ও প্রতিষ্ঠিত সংস্থার শেয়ার কিনছেন। বাজারের সব শেয়ারে নির্বিচারে বিনিয়োগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।