অরুণোদয় থেকে রাহুল হয়ে ওঠার এক অসম্পূর্ণ রূপকথা
সিনেমায় আসার আগে ছোট পর্দায় নিজের মাটি শক্ত করেছিলেন রাহুল। জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘খেলা’-তে আদিত্যর চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছিল। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০০৮ সালে। রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনি তুমি যে আমার’ ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকারের বিপরীতে তাঁর অভিনয় রাতারাতি তাঁকে সুপারস্টারের তকমা এনে দেয়। ছবির গান থেকে শুরু করে রাহুলের সেই ইনোসেন্ট লুক— আজও বাঙালির নস্টালজিয়া। এই ছবির জন্যই তিনি প্রচুর পুরস্কারে পেয়েছেন তিনি। এরপর জ্যাকপট, ‘লভ সার্কাস’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, ‘পতি পরমেশ্বর’-এর মতো একাধিক ছবিতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।

টলিউড স্তব্ধ! এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না, বাংলা বিনোদন জগত থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেলেন রাহুল ওরফে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায়। রবিবাসরীয় সন্ধেতে এ খবর নাড়া দিল গোটা ইন্ডাস্ট্রিতে। বাংলা চলচ্চিত্র এবং নাট্যজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। মাত্র ৪২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অভিনেতা অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁকে আপামর বাঙালি ‘রাহুল’ নামেই চিনতেন। পর্দার ‘কৃষ্ণ’ হোক বা মঞ্চের দাপুটে অভিনেতা— তাঁর অকাল প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্টুডিও পাড়া থেকে নাট্যমঞ্চের অলিন্দে।
১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর এক নাট্য পরিবারে জন্ম রাহুলের। রক্তেই ছিল অভিনয়। বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের থিয়েটার দল ‘বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ’-এর হাত ধরে মাত্র তিন বছর বয়সে ‘রাজদর্শন’ নাটকে প্রথম মঞ্চে পা রাখেন তিনি। এরপর দীর্ঘ কেরিয়ারে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি স্টেজ শো করেছেন রাহুল। থিয়েট্রন-এর মতো দলের সঙ্গেও তাঁর নিয়মিত যোগ ছিল। অভিনয়ের প্রতি এই নিখাদ টানই তাঁকে পরবর্তীকালে পর্দার লড়াইয়ে অক্সিজেন জুগিয়েছিল।
সিনেমায় আসার আগে ছোট পর্দায় নিজের মাটি শক্ত করেছিলেন রাহুল। জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘খেলা’-তে আদিত্যর চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছিল। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০০৮ সালে। রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনি তুমি যে আমার’ ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকারের বিপরীতে তাঁর অভিনয় রাতারাতি তাঁকে সুপারস্টারের তকমা এনে দেয়। ছবির গান থেকে শুরু করে রাহুলের সেই ইনোসেন্ট লুক— আজও বাঙালির নস্টালজিয়া। এই ছবির জন্যই তিনি প্রচুর পুরস্কারে পেয়েছেন তিনি। এরপর জ্যাকপট, ‘লভ সার্কাস’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, ‘পতি পরমেশ্বর’-এর মতো একাধিক ছবিতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। তবে শুধুই সিনেমা নয়, টেলিভিশনের পর্দাতেও রাহুল তাক লাগিয়ে ছিলেন। দেশের মাটি ধারাবাহিকের রাজা চরিত্র এখনও উজ্জ্বল। একের পর এক সিরিজেও অভিনয় করেছেন রাহুল। তাঁর শেষ অভিনীত ছবি অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস এবং রাপ্পা রায় ও ফুলস্টপ ডট কম। এখানেই শেষ নয়, নাটকের মঞ্চে পরিচালক সৌরভ পালোধীর যে জানালা গুলো আকাশ ছিল নাটকে মন জয় করছিলেন রাহুল। তাঁর পডকাস্ট সহজ কথায়, উঠে আসত বিনোদন জগতের কথা। ভালো লিখতেন, ভালো কবিতা বলতেন।
রাজ চক্রবর্তীর চিরদিনই তুমি যে আমার ছবি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই সময়ই সহ অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে পর্দার প্রেম বাস্তবেও পরিণতি পেয়েছিল। সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রাহুল। তাঁদের কোল আলো করে আসে একমাত্র সন্তান সহজ বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও ২০১৭ সালে তাঁদের বিচ্ছেদের খবরে মন ভেঙেছিল অনুরাগীদের, তবে ২০২৩ সালে সমস্ত তিক্ততা ভুলে তাঁরা আবার এক হয়েছিলেন। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং নিজেদের ভালোবাসার টানেই তাঁরা নতুন করে সংসার শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই পুনর্মিলনের আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী যেন হল না।
রাহুলের চলে যাওয়া মানে এক দক্ষ অভিনেতার পাশাপাশি এক নির্ভীক মঞ্চকর্মীর প্রস্থান। আশুতোষ কলেজের প্রাক্তনী এবং নাকতলা হাই স্কুলের এই ছাত্রটি বরাবরই স্পষ্টবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রিয় অভিনেতা হয়তো চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন, কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি বাঙালির হৃদয়ে ‘চিরদিনি’ অম্লান হয়ে থাকবে।
