
নয়ের দশকে দূরদর্শনের পর্দায় মহালয়ার ভোর মানেই এক অন্য উন্মাদনা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের সঙ্গে দেবী দুর্গার সঙ্গে সেই ভয়াল লড়াই এবং মহিষাসুরের সেই অট্টহাসি ও বলিষ্ঠ শারীরিক উপস্থিতি—বাঙালির মনে আজও অমলিন। সেই মহালয়ার পর্দার চিরকালের ‘অসুর’ বা ‘অমল অসুর’ হিসেবে পরিচিত প্রবীণ অভিনেতা অমল চৌধুরী আজ আর নেই। চরম অভাব, একাকীত্ব আর অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে অশোকনগরের তাঁর নিজস্ব বাসভবনের তালা ভেঙে অভিনেতার মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।
অশোকনগরের সিংহি পার্ক এলাকার একটি টিনের চালের ঘরে একাই থাকতেন অমলবাবু। চিরকুমার এই মানুষটির জীবনের শেষ বছরগুলো কেটেছিল অত্যন্ত করুণ ও নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে। একে একে বাবা-মা, দাদা-দিদিরা সবাই তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন বহু আগেই। অসুস্থতা ছিল নিত্যসঙ্গী, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাঁকিয়ে বসেছিল তীব্র অভাব-অনটন। ঠিকমতো দু’মুঠো ভাত জোটাতেও হিমশিম খেতে হত তাঁকে।
ঘটনার দিন সকাল থেকেই তাঁর ঘরের কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। ডাকাডাকি করেও কোনও উত্তর না মেলায় অবশেষে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে দরজা বা তালা ভেঙে অমলবাবুর নিথর দেহ উদ্ধার করে। জানা যায়, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই মৃত্যু হয়েছিল চেনা সেই অসুরের।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা ছিল অমল চৌধুরীর। একটা ভালো কাজের আশায় শেষ বয়সেও কম হা-পিত্যেশ করেননি তিনি। অথচ একসময় মহালয়ার পর্দায় তাঁর দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু অসুরই নন, মহালয়ায় যমরাজ কিংবা সেনাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রও সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। এছাড়া বেশ কিছু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন অমল।
ছোটবেলায় চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও মহালয়ার প্রতি আজীবন টানের ফলেই তিনি অভিনয় দুনিয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। শুধু অভিনয়ই নয়, নিখুঁত আঁকা জানতেন তিনি। হাজার হাজার শিশুকে বিনা স্বার্থে আঁকা শিখিয়েছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাইমলাইট থেকে হারিয়ে যাওয়ায় চরম অবহেলায় দিন কাটাতে হচ্ছিল তাঁকে। ২০২৫ সালে এক দুর্ঘটনায় তাঁর পায়ে চিড় ধরেছিল। সংবাদমাধ্যমের সামনে চিকিৎসার জন্য সাড়ে তিন লক্ষ টাকার আবেদনও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সাহায্য আর সময়মতো এসে পৌঁছয়নি। টাকা জোগাড় হওয়ার আগেই সব শেষ!