
একসময় তাঁর ছবির জায়গা হয়নি ‘নন্দন’-এ। তর্ক-বিতর্ক হয়েছে বহু। ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। এবার মৃত্যুর পর সেই প্রাঙ্গণেই শায়িত অনীক দত্ত (Anik Dutta)! পরিচালক অনীক দত্ত (Anik Dutta)-র সঙ্গে শাসকদলের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস টলিপাড়ায় কান পাতলেই শোনা যায়। কিন্তু নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস! যে নন্দন তাঁকে দিনের পর দিন ফিরিয়ে দিয়েছে, আজ মৃত্যুর পর সেখানেই তাঁকে শেষবারের মতো দেখবেন ভক্তরা।
বৃহস্পতিবার শোনা গিয়েছিল, পরিচালকের মৃতদেহ রাখা হবে এনটি ওয়ান স্টুডিয়োতে। কিন্তু সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে জানা গিয়েছে, আজ শুক্রবার রাজ্য সরকারের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র নন্দনেই শায়িত থাকবেন ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর এই পরিচালক।
গত বুধবার দুপুরে দক্ষিণ কলকাতায় প্রাক্তন স্ত্রী’র আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তাঁর। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি সুইসাইড নোট। এসএসকেএম হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে, পতনের অভিঘাতে তাঁর মাথার বাঁ দিকের খুলির হাড় ও পাঁজর ভেঙে গিয়েছে। শরীরে রয়েছে একাধিক গুরুতর আঘাত। এই আকস্মিক মৃত্যুতে এমনিতেই শোকস্তব্ধ টলিপাড়া। তার ওপর শেষকৃত্যের স্থান নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা বিষয়টিকে আরও চর্চায় নিয়ে আসে।
উল্লেখ্য, সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির নেপথ্য কাহিনি নিয়ে অনীক দত্ত সেলুলয়েডে বুনেছিলেন ‘অপরাজিত’। ছবিটি দেশ জুড়ে প্রশংসা পেলেও, তৎকালীন নন্দনের স্ক্রিনিং কমিটি তাঁকে জায়গা দেয়নি। নেপথ্যের কারণ হিসেবে উঠে এসেছিল রাজনীতি।
সংঘাতের গল্প এখানেই শেষ নয়। তাঁর পরিচালিত ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’ সিবিএফসি-র (CBFC) ছাড়পত্র পাওয়া সত্ত্বেও বাংলায় তাঁর প্রদর্শন কার্যত জোর করে আটকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিচালক ছিলেন হার না মানা এক যোদ্ধা। প্রযোজককে সঙ্গে নিয়ে সোজা আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। আইনি লড়াইয়ে জেতেন এবং তৎকালীন সরকারকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর মাথা উঁচু করেই শহরে মুক্তি পেয়েছিল সেই ছবি।
নন্দনের সঙ্গে তাঁর সমীকরণ যে কতটা তিক্ত ছিল, তার আরও একটি উদাহরণ মেলে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সময়। উৎসব চলাকালীন গোটা নন্দন চত্বর কেন মুখ্যমন্ত্রীর ছবিতে মুড়ে ফেলা হয়েছে, তা নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনীক দত্ত। কোনও রাখঢাক না করেই তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। আজ সেই নন্দন তাঁর শেষ সফরের সাক্ষী। যে মানুষটার শিল্পকে একসময় রাজনৈতিক আক্রোশে আটকে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে, আজ তাঁরই নিথর দেহকে সম্মান জানাতে প্রস্তুত নন্দন চত্ত্বর। মৃত্যুর কাছে কি তবে মুছে গেল যাবতীয় রাজনৈতিক তিক্ততা?
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে যে নন্দনের দরজা অনীক দত্তর ছবির জন্য একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই নন্দনেই এবার সসম্মানে ফিরছেন প্রয়াত পরিচালকের ছবি। তাঁর তৈরি সিনেমা নিয়ে নন্দন প্রেক্ষাগৃহে একটি বিশেষ চলচ্চিত্র উৎসবের পরিকল্পনা করছে রাজ্যের নতুন সরকার। অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, “আগের সরকার যেভাবে প্রতিশোধের রাজনীতি করে এসেছে, সেটা আমাদের সবার জানা। সেই কারণেই অনীক দত্তর মতো স্বাধীনচেতা পরিচালককে নন্দনে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তাঁর ছবিকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল।” অনীক দত্তকে যোগ্য সম্মান জানাতে বর্তমান জমানায় যে বিশেষ চলচ্চিত্র উৎসবের নীলনকশা তৈরি হচ্ছে। রুদ্রনীল ঘোষ, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী এবং হিরণ চট্টোপাধ্যায় এই উৎসবের রূপরেখা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। নন্দনের পর্দায় অনীকের সিনেমা প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁর শিল্পসত্তাকে উদযাপন করাই এই কমিটির মূল লক্ষ্য।