
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বলিউড যখন লতা মঙ্গেশকরের ধ্রুপদী কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ, ঠিক তখনই এক বিদ্রোহী সুরকারের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি ও পি নায়ার। যাঁর সুরে কোনওদিন লতা মঙ্গেশকর কণ্ঠ দেননি, কিন্তু যাঁর হাত ধরেই নেপথ্য গায়িকা হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য গড়েছিলেন আশা ভোঁসলে।
কেরিয়ারের শুরুর দিকে আশা ভোঁসলেকে মূলত দ্বিতীয় সারির গায়িকা বা ভ্যাম্প ও পার্শ্ব চরিত্রদের জন্য গান গাইতে দেওয়া হতো। লতা মঙ্গেশকরের একাধিপত্যের যুগে আশা যেন কিছুটা প্রান্তিক হয়েই ছিলেন। ঠিক এই সময়েই ও পি নায়ার তাঁকে চিনেছিলেন। নায়ারের বিশ্বাস ছিল, আশার কণ্ঠের মধ্যে যে আবেদন এবং আধুনিকতা রয়েছে, তা অন্য কারও নেই। ১৯৫৪ সালে ‘বাপ রে বাপ’ থেকে শুরু হওয়া এই জুটি ‘হাওড়া ব্রিজ’, ‘এক মুসাফির এক হাসিনা’র মতো একের পর এক ছবিতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। আশাকে তিনি কেবল নায়িকার কণ্ঠই দিলেন না, বরং বানালেন বলিউডের ‘গ্ল্যামার ভয়েস’।
ও পি নায়ার ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাঁকে সমকালীন শ্রেষ্ঠ গায়িকা লতা মঙ্গেশকরের দ্বারস্থ হতে হয়নি। যেখানে অন্যান্য সুরকাররা লতার ডেটের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতেন, সেখানে নায়ার দম্ভের সাথে ঘোষণা করেছিলেন যে লতার কণ্ঠ তাঁর তালের সঙ্গে খাপ খায় না। এই অভাব তিনি পূরণ করেছিলেন আশাকে দিয়ে। সুরকার ও গায়িকার এই ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পেশাগত বোঝাপড়া সংগীতে এক নতুন ঘরানার জন্ম দিয়েছিল।
নায়ার ও আশার সম্পর্ক কেবল রেকর্ডিং স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ সময় তাঁরা একে অপরের ছায়াসঙ্গী হয়ে কাটিয়েছেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে এক তিক্ত বিচ্ছেদের মাধ্যমে এই সম্পর্কের যবনিকা পড়ে। আশ্চর্যের বিষয় হল, সেই বিচ্ছেদের পর ও পি নায়ার আর কোনওদিন আশার সঙ্গে কাজ করেননি, এমনকি কোনো গানে তাঁর কণ্ঠও ব্যবহার করেননি। একইভাবে আশা ভোঁসলেও তাঁর আত্মজীবনী বা সাক্ষাৎকারে দীর্ঘ সময় ও পি নায়ারকে নিয়ে এক রহস্যময় নীরবতা বজায় রেখেছিলেন।
আজও ‘আয়ে মেহেরবান’ বা ‘ইয়ে হ্যায় রেশমি জুলফো কা আন্ধেরা’র মতো গানগুলো যখন বেজে ওঠে, তখন বোঝা যায় ও পি নায়ার কতটা আধুনিক ছিলেন। লতা মঙ্গেশকরের সুরেলা গাম্ভীর্যের বিপরীতে আশার কণ্ঠে যে প্রাণের জোয়ার তিনি এনেছিলেন, তা আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ও পি নায়ার না থাকলে আশা ভোঁসলে হয়তো আজীবন ‘দ্বিতীয় লতা’ হয়েই থেকে যেতেন, নিজস্ব পরিচয় পাওয়া তাঁর জন্য অনেক কঠিন হত।