
দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব, আপসহীন সততা এবং নিখাদ নির্ভীক জীবনদর্শনের পাশাপাশি নানা পাটেকরের মুকুটে আরও একটি বিশেষত যুক্ত ছিল—তাঁর তীক্ষ্ণ ও ব্যতিক্রমী রসবোধ। জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত মৃত্যুকে নিয়ে কোনও লুকোচুরি বা ভীতি নয়, বরং এক পরম দার্শনিক ও রসিকসুলভ ভঙ্গিতে সবকিছু গ্রহণ করেছিলেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু তথা প্রবীণ অভিনেতা অনুপম খের নানা পাটেকরের প্রয়াণের পর এক শোকবার্তায় সেকথাই স্মরণ করেছেন। অনুপমের কথায়, “আজ যদি নানা আমাদের এই শ্রদ্ধার্ঘ্য বা কান্নাকাটি দেখত, তবে হেসেই উড়িয়ে দিত। বলত— ‘আরে তাতে কী হয়েছে? মারা গিয়েছি তো, কী এমন বড় ব্যাপার? সকলকেই তো একদিন মরতে হয়।’” পরপারের অচেনা সফর যাঁর মনে লেশমাত্র ভয় ধরাতে পারেনি, মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগেও যিনি অবলীলায় বলে গিয়েছিলে, “সবাইকেই একদিন চলে যেতে হবে, জানি না আগামী কাল বেঁচে থাকব কি না”—সেই নানাই তাঁর নিজের শেষকৃত্যের সমস্ত বন্দোবস্ত বহু আগেই গুছিয়ে রেখে গিয়েছিলেন।
বছর দুয়েক আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার’ (The Vaccine War) সিনেমার প্রচারের সময় এক সাক্ষাৎকারে নিজের মৃত্যু ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও মন ছুঁয়ে যাওয়া তথ্য শেয়ার করেছিলেন নানা পাটেকর। অভিনেতা নিজেই জানিয়েছিলেন, একদিন তাঁকেও এই ধরণী ছেড়ে চিরবিদায় নিতে হবে। আর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র অর্জিত সম্পত্তি বলতে থাকবে কেবল ‘১২ মণ কাঠ’।
কেন এমন কথা বলেছিলেন তিনি? নিজেই তার ব্যাখ্যা দিয়ে নানা বলেছিলেন, “আমি জানি আমার শেষকৃত্যের জন্য ঠিক ১২ মণ কাঠ লাগবে। এটাই আমার শেষ সম্বল এবং এটুকুই সঙ্গে নিয়ে আমি দুনিয়া থেকে বিদায় নেব।” নিজের অন্ত্যেষ্টির জন্য ওই পরিমাণ কাঠ যে তিনি ইতিমধ্যেই আলাদা করে জমিয়ে বা নির্দিষ্ট করে রেখে দিয়েছিলেন, সে কথাও অকপটে স্বীকার করেছিলেন তিনি।
তবে এখানেই শেষ নয়; নিজের শেষকৃত্য কেমন হবে, তা নিয়ে এক মজার ও অভিনয় নির্দেশও দিয়ে গিয়েছিলেন নানা পাটেকর। তিনি জোর দিয়ে বলে দিয়েছিলেন যে, তাঁর শেষকৃত্য যেন কোনওভাবেই ভেজা কাঠ দিয়ে না করা হয়, বরং পুরোপুরি শুকনো কাঠই যেন ব্যবহার করা হয়।
এর নেপথ্যের কারণ হিসেবে নানা যে যুক্তি দিয়েছিলেন, তা শুনলে যে কেউ অবাক হবেন এবং একই সঙ্গে তাঁর রসবোধের তারিফ না করে পারবেন না। নানা পাটেকর রসিকতা করে বলেছিলেন, “ভেজা কাঠ ব্যবহার করলে অনেক বেশি ধোঁয়া হবে। আর সেই ধোঁয়ার চোটে শেষকৃত্যে উপস্থিত আমার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-পরিজনদের চোখে জল চলে আসবে। আর সেই চোখের জল দেখে কেউ আবার ভুল বুঝতে পারে যে আমি চলে যাওয়ার কারণে তারা হয়তো কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে! আমি চাই না আমার শেষকৃত্যে সামান্য ধোঁয়ার কারণে কোনও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হোক।”
মৃত্যুর মতো চরম ও গম্ভীর একটি সত্যকে নিজের নিখুঁত সেন্স অফ হিউমার দিয়ে এমন লঘু ও সুন্দর করে তুলে ধরার ক্ষমতা কেবল নানা পাটেকরের পক্ষেই সম্ভব ছিল। কেরিয়ার জুড়ে যিনি নিজের অভিনয়ে যেমন পর্দা কাঁপিয়েছেন, তেমনই জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও এই ধরনের চিন্তাভাবনা প্রমাণ করে গেল যে তিনি ছিলেন এক অনন্য ও অসাধারণ প্রাণের মানুষ। শেষ পর্যন্ত পুণের নিজস্ব ফার্মহাউসেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে রেখে যাওয়া তাঁর সেই ১২ মণ কাঠই হয়ে রইল এই নশ্বর পৃথিবীর শেষ ঠিকানা।