
পুজোর মেজাজ হোক কিংবা রেডিওর সুর—বাঙালির নস্ট্যালজিয়ার তালিকায় যে কয়েকটি গান চিরন্তন স্থান করে নিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’। আশার মিষ্টি গায়কি আর আর. ডি. বর্মনের অনবদ্য সুরের মেলবন্ধনে ১৯৭৭ সালের দুর্গাপুজোর সেই গান রাতারাতি ইতিহাস তৈরি করেছিল। তবে শুধু গান নয়, এই গানের রেকর্ডিং ও সৃষ্টির নেপথ্যে জড়িয়ে রয়েছে এক দারুণ ইতিহাস এবং পঞ্চমের এক অনন্য উপহারের গল্প!
বাঙালির আধুনিক গানের স্বর্ণযুগে এইচএমভি (HMV) থেকে প্রকাশিত পুজো অ্যালবামের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। ১৯৭৭ সালের তেমনই এক পুজোর অ্যালবামের জন্য তৈরি হচ্ছিল গানটি। চটুল, মিষ্টি অথচ ওয়েস্টার্ন আর লোকসংগীতের এক অদ্ভুত যুগলবন্দি ঘটিয়েছিলেন পঞ্চম। আর এই চিরসবুজ সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অসাধারণ কথা লিখেছিলেন বিখ্যাত গীতিকার ও সুরকার স্বপন চক্রবর্তী। স্বপন বাবুর চমৎকার শব্দচয়ন এবং আশার কণ্ঠের মায়াবী আবেগ গানটিকে শোনামাত্রই শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরিয়ে দিয়েছিল। তবে শোনা যায়, এই গানটি রেকর্ডিংয়ের সময় আশার গলায় নাকি কিছুতেই দুষ্টুমি ধরা পড়ছিল না, অন্তত, আরডি ঠিক যেমনটি চাইছিলেন। সে কারণে নাকি আশাকে বকাও দিয়েছিলেন পঞ্চম। কিন্তু তারপরই রেকর্ডিং স্টুডিওতে ঘটল ম্যাজিক।
গানটির ট্র্যাক রেকর্ড করার পর স্টুডিওতে যখন আশা ভোঁসলে তাঁর ফাইনাল ভয়েস রেকর্ড করছিলেন, তখনই এর সুর ও শব্দের জাদু অনুভব করেছিলেন পঞ্চম। ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’ নামটির মধ্যেই ছিল এক ধরনের চঞ্চলতা ও মিষ্টি আবদার। রেকর্ডিং শেষ হতেই পঞ্চমের মন এতটাই ভরে যায় যে, তিনি সোজা বাজারে গিয়ে গায়িকা আশা ভোঁসলের জন্য কিনে আনেন একডজন আসল কাচের রেশমি চুড়ি! উপহারটি হাতে পেয়ে যেমন চমকে গিয়েছিলেন আশা। আশা ভোঁসলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়ে ছিলেন, পঞ্চমের থেকে পাওয়া জীবনের সেরা উপহার সেই এক ডজন চুড়ি।
সংগীতপ্রেমীরা জানেন, পঞ্চমের একটি বিশেষ অভ্যাস ছিল—তাঁর তৈরি কোনও বাংলা সুর সুপারহিট হলে কিংবা মনের খুব কাছাকাছি পৌঁছালে, তিনি সেই সুর পরবর্তীতে হিন্দি চলচ্চিত্রেও ফিরিয়ে আনতেন। ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’ গানটির ক্ষেত্রও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
বাংলায় গানটি রেকর্ড হওয়ার ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় অমিতাভ বচ্চন ও রণধীর কাপুর অভিনীত ব্লকবাস্টার হিন্দি ছবি ‘কসমে বাদে’ (Kasme Vaade)। ছবিটির চিত্রনাট্যে দুই ভাইয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলতে সেই বিখ্যাত বাংলা সুরেই তৈরি হয় কালজয়ী হিন্দি ট্র্যাক— “মিলে জো কড়ি কড়ি, এক বনে পুরা লড়ি”! কিশোর কুমার ও লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে সেই গানটিও হিন্দি ছবির দুনিয়ায় ইতিহাস তৈরি করে।