
বাঙালির নববর্ষ মানেই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় শুভেচ্ছা আর রেস্তোরাঁয় ভিড়। কিন্তু আজ থেকে সাত দশক আগে পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যা মানেই ছিল ভবানীপুরের ‘বসুশ্রী’ সিনেমা হল। আর এই উন্মাদনার নেপথ্যে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁকে এক ডাকে চিনত তিলোত্তমা থেকে বলিউড— হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
পঞ্চাশের দশকের গোড়ার কথা। বসুশ্রীর আড্ডায় তখন ভাঁড়ের চা আর পূর্ণ ঘোষের দোকানের খাস্তা শিঙাড়ার সুবাস। আড্ডার মেজাজ বুঝে একদিন হেমন্তবাবু হলের কর্ণধার মন্টু বসুকে প্রস্তাব দিলেন, “শোন মন্টু, সামনেই পয়লা বৈশাখ। তোর হলে এত জায়গা, একটা জমজমাট জলসা করলে কেমন হয়?” তখন এ দেশে ‘জলসা’ বা মিউজিক্যাল সোহরের ধারণা সেভাবে তৈরি হয়নি। কিন্তু হেমন্তবাবুর এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন মন্টু বসু। প্রতিশ্রুতি দিলেন হেমন্তবাবুও— বম্বেতে (মুম্বই) যত কাজই থাকুক, নববর্ষের সন্ধ্যায় তিনি বসুশ্রীর মঞ্চে থাকবেনই।
বসুশ্রীর এই জলসা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য অবারিত দ্বার। কোনো টিকিটের বালাই ছিল না, তাই ভোর থেকেই হলের সামনের ফুটপাথে লম্বা লাইন পড়ত বাঙালির। ভিড়ের চাপে থমকে যেত হাজরা মোড়। একবার মহানায়ক উত্তম কুমার আসছেন শুনে এমন উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল যে, নিরাপত্তার খাতিরে তাঁকে পিছনের দরজা দিয়ে হলে ঢোকাতে হয়েছিল। ভেতরে তিল ধারণের জায়গা না থাকায় রাস্তার ওপর সামিয়ানা টাঙিয়ে মাইক বেঁধে দেওয়া হতো। রাস্তায় দাঁড়িয়েই সাধারণ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতেন উত্তম কুমারের ভাষণ কিংবা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একক উদ্যোগে এই মঞ্চে কারা না এসেছেন! লতা মঙ্গেশকর থেকে শুরু করে শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়— প্রত্যেকেই এই জলসায় অংশ নেওয়াকে পরম প্রাপ্তি বলে মনে করতেন। শিল্পীদের কাছে এটি ছিল এক মিলনমেলা, আর সাধারণ মানুষের কাছে নতুন বছরের সেরা উপহার।
আজও সেই স্বর্ণযুগের শিল্পীরা বসুশ্রীর কথা উঠলে নস্ট্যালজিক হয়ে পড়েন। ইতিহাসের পাতায় পয়লা বৈশাখের সেই সাবেকি উদযাপন আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই উদাত্ত কণ্ঠ আজও অমলিন। বসুশ্রী হলের সেই জলসা ছাড়া বাঙালির নববর্ষ যেন আজও অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে স্মৃতির অ্যালবামে।