
যুগ পাল্টেছে। শহুরে জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারীরা আজ অনেক বেশি সাবলীল, কুসংস্কারের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে তাঁরা এখন অনেকটাই মুক্তমনা। দশভূজা হয়ে ঘর-বাইরে দুই-ই সামলাচ্ছেন সমান দক্ষতায়। কিন্তু এই ঝাঁ-চকচকে চেনা ছবির বাইরেও একটা অন্য ভারত রয়েছে, যা কিনা গ্রাম বা মফঃস্বলের সমাজ। সেখানে আজও পিরিয়ডস বা ঋতুস্রাব মানেই ফিসফাস, একরাশ লজ্জা আর ট্যাবু। শিক্ষার আলো হয়তো পৌঁছেছে, কিন্তু মানসিকতার অন্ধকার কাটেনি এতটুকুও।
সমাজের এই অন্ধকার দিকটি নিয়েই এবার সরব হলেন অভিনেত্রী-গায়িকা তথা হৃতিক রোশনের প্রেমিকা সাবা আজাদ। খুব শিগগিরই ‘হু ইজ ইয়োর গাইনোকোলজিস্ট’-এর দ্বিতীয় সিজনে অভিনেতা কুণাল ঠাকুরের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করতে দেখা যাবে তাঁকে। তাঁর আগেই ঋতুস্রাব নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা, সামাজিক ছুঁতমার্গ ও লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে তীব্র হতাশা প্রকাশ করলেন তিনি।
সাবার মতে, পিরিয়ডস নিয়ে একটু এদিক-ওদিক হলেই ছোট শহরের মেয়েদের আজও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। কারও পিরিয়ডস দেরিতে হলে পরিবারের অন্দরমহলে চর্চা শুরু হয়ে যায়, অবলীলায় মেয়েটিকে ‘অসুস্থ’ বা ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে দেগে দেওয়া হয়। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবের চেয়েও সমাজের এই ‘মানসিক ব্যাধি’ অনেক বেশি ভয়ংকর বলে মনে করেন তিনি।
এই ছুঁতমার্গের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়ে সাবা বলেন, ঋতুস্রাব কোনও লুকোনোর বা লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাঁর সোজাসাপটা যুক্তি, “মানুষ এটা একবারও ভাবে না যে ঋতুস্রাব না হলে সন্তানধারণ অসম্ভব। আর সন্তান না এলে একটা সময় এই পৃথিবী থেকে মানবজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে! তাই নারীর শরীরকে এই চক্রের জন্য সম্মান করা উচিত, উদযাপন করা উচিত। নতুন প্রাণের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা তো এই ঋতুস্রাবের হাত ধরেই আসে।”
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে সমাজের এই পিছিয়ে থাকা মানসিকতায় রীতিমতো হতাশ সাবা। ঋতুস্রাব চলাকালীন রান্নাঘরে ঢোকার নিষেধাজ্ঞা বা অশুচি মনে করার মতো বিষয়গুলোকে তিনি সরাসরি ‘চূড়ান্ত রক্ষণশীলতার নিদর্শন’ বলে তোপ দেগেছেন। তাঁর আক্ষেপ, “২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও আমাদের এই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। বিজ্ঞান আজ অনেকটা এগিয়েছে, এবার অন্তত আমাদের নিজেদের একটু শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।”
সমাজের এই বৈষম্যের বীজ ঠিক কীভাবে বোনা হয়, সেই দিকেও আঙুল তুলেছেন অভিনেত্রী। বড়দের মানসিকতাকেই এর জন্য দায়ী করে তাঁর মন্তব্য, “শিশুরা অনেকটা স্পঞ্জের মতো, চারপাশ থেকে তারা সবকিছু শুষে নেয়। কিন্তু আমরা বড়রাই জানি না তাদের কী শেখাতে হবে! শিশুদের সঠিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার বদলে আমরা তাদের মগজে কুসংস্কার, লজ্জা আর ট্যাবু ঢুকিয়ে দিচ্ছি।”
সাবার এই স্পষ্ট বক্তব্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, নারী স্বাধীনতার যতই জয়গান গাওয়া হোক না কেন, ঋতুস্রাব নিয়ে সমাজের গভীরে থাকা শেকড়টা বদলাতে এখনও অনেকটা পথ হাঁটা বাকি।