
টলিপাড়ার দুই মহাতারকা— উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন। একজনের বাড়িতে যেমন ঘটা করে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হতো, তেমনই পিছিয়ে ছিলেন না মহানায়িকাও। বালিগঞ্জের বাড়িতে সুচিত্রা সেনের হাতের লক্ষ্মীপুজো মানেই ছিল এক অন্য আবেগ ও আভিজাত্যের মেলবন্ধন। রঙিন দুনিয়ার চকচকে গ্ল্যামার ছেড়ে ঘরের অন্দরে তিনি কীভাবে মাটির মানুষ হয়ে উঠতেন, তার গল্প আজও মুগ্ধ করে।
বাইরের দুনিয়া তাঁকে ‘ম্যাডাম সেন’ হিসেবেই চিনত। ইন্ডাস্ট্রির অনেকের মতেই তিনি ছিলেন বেশ অভিমানী ও আত্মগৌরবে লিপ্ত। কিন্তু যাঁরা মহানায়িকাকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানতেন এই ইমেজের উলটো পিঠেই ছিল এক অন্য মানুষ। পরিচালক বা সহকর্মীদের কাছে তিনি হয়তো একটু দূরত্ব বজায় রাখতেন, কিন্তু নিজ পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি ছিলেন নিখাদ ঘরের মেয়ে, স্নেহময়ী মা এবং এক দারুণ গৃহিণী।
জানা যায়, অতিথিস্পৃহায় সুচিত্রার জুড়ি মেলা ভার ছিল। বাড়িতে কেউ অতিথি এলে তিনি নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াতেন। বিশেষ করে তাঁর হাতের নিরামিষ রান্না, বিশেষ করে সুস্বাদু চচ্চড়ি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। ঘরের অন্দরে আটপৌরে শাড়ি আর বিন্দুমাত্র মেকআপহীন সাদামাটা লুকে থাকতে ভালোবাসতেন তিনি।
তবে সাদামাটা জীবন কাটালেও লক্ষ্মীপুজোর দিন যেন রূপ বদলাত সুচিত্রার। ওই একটি দিন তিনি সেজে উঠতেন একেবারে মা লক্ষ্মীর আদলে— পরনে থাকত লাল পেড়ে সাদা শাড়ি আর সোনার গয়না। শুধু নিজে সাজাই নয়, নিজ হাতে দেবীকেও সাজাতেন তিনি। সুন্দর শাড়ি ও সোনার গয়নায় সুচিত্রার হাতের প্রতিমা যেন জীবন্ত হয়ে উঠত।
পুজোর সমস্ত আয়োজন থাকত সুচিত্রার নিজের কাঁধে। সারা দিন উপোস থেকে নিজে হাতে ফল-সবজি কাটা থেকে শুরু করে পুজোর জোগাড়— সবটাই করতেন তিনি। সঙ্গে থাকত কন্যা মুনমুন সেন। মুনমুন ছোট থেকেই দারুণ আঁকতে পারতেন, তাই মায়ের নির্দেশে সুচিত্রার বাড়ি জুড়ে নিখুঁত আলপনা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাঁরই ওপর।
শোনা যায়, সুচিত্রা সেন স্বপ্নে মা লক্ষ্মীকে দেখার পরেই নাকি নিজের বাড়িতে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই দিব্য স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েই প্রতি বছর আড়ম্বরে পুজো হতো তাঁর বাড়িতে। টালিউডের বহু নামী ব্যক্তিত্বই উত্তমের বাড়ির পুজো ঘুরে সুচিত্রার বাড়ি আসতেন, আবার অনেকে উলটো পথ ধরতেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হল, পুজো শেষে বিশাল আকৃতির সেই লক্ষ্মী প্রতিমা নৌকায় করে গঙ্গায় বিসর্জন দিতে স্বয়ং মহানায়িকা ঘাটে উপস্থিত থাকতেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট থেকে দূরে থেকেও মহানায়িকার অন্দরের সেই পুজো আজও টলিপাড়ার এক সোনালী অধ্যায়।