
টলিউডের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন অনেক অজানা গল্প উঠে আসে, যা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আজও বিস্মিত করে। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল অভিনেতা ও পরিচালক সুখেন দাস—যাঁর কেরিয়ারের সূচনা হয়েছিল এক সাধারণ স্পটবয় হিসেবে। কঠোর পরিশ্রম আর প্রতিভার জোরে পরবর্তীতে তিনি টলিউডকে উপহার দিয়েছিলেন একের পর এক ব্লকবাস্টার হিট, মন ছুঁয়ে যাওয়া গান আর পরিবারকেন্দ্রিক আবেগঘন নাটক। তবে সেই সুখেন দাসকেই একসময় নিজের বাড়ি থেকে কার্যত তাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং ‘মহানায়িকা’ সুচিত্রা সেন!
ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক সেই সময়ে, যখন মহানায়িকা নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখনও রুপোলি পর্দায় তাঁর প্রভাব ও দাপট ছিল প্রশ্নাতীত।
টলিউডে সুচিত্রা সেনের গম্ভীর ব্যক্তিত্বের কথা ভেবে শুরুতে একটু সমঝে চলতেন সুখেন দাস। তবে ১৯৫৪ সালে প্রখ্যাত পরিচালক দেবকী কুমার বসুর ‘ভালোবাসা’ ছবির ফ্লোরে ঘটে যায় ছন্দবদল। ছবির শুটিং চলাকালীনই সাধারণ স্পটবয় সুখেনের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের সখ্য গড়ে ওঠে। সুখেনকে স্নেহের চোখে দেখতেন তিনি, ডাকতেন ‘ভাই’ বলে। আর সুখেনও তাঁকে মানতেন নিজের ‘দিদি’ হিসেবে। সেটে এলেই সুচিত্রা আগে খোঁজ নিতেন সুখেনের। কালক্রমে সেই স্পটবয় যে নিজের যোগ্যতায় ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারির পরিচালক ও অভিনেতা হয়ে উঠেছেন, সেই খবরও নিয়মিত পৌঁছত ম্যাডাম সেনের কাছে। আর সেই অধিকার ও স্নেহের সম্পর্ক থেকেই পরবর্তীতে দানা বাঁধে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক।
ততদিনে সুচিত্রা সেন বড় পর্দা থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন। অন্যদিকে সুখেন দাসের ঝুলিতে একের পর এক বক্স অফিস সাফল্য। দিদির কথা মাথায় রেখেই একটি নতুন সিনেমার আবেগঘন চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন সুখেন। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই পাণ্ডুলিপি বগলে সোজা হাজির হন সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জের বাসভবনে।
সেদিন সুখেনকে বেশ কিছুক্ষণ বসার ঘরে অপেক্ষা করতে হয়েছিল, কারণ সুচিত্রা তখন ঠাকুরঘরে নিজের নিত্যপূজায় ব্যস্ত। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর পুজো শেষ করে, স্নিগ্ধ নীল রঙের শাড়ি পরে ঘরে এসে দাঁড়ান মহানায়িকা। সুচিত্রাকে দেখে সুখেনের মনে হয়েছিল, এ যেন তাঁর সাদা পাতায় আঁকা সেই মূল চরিত্রটিই হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে! কিন্তু সুখেন তাঁর আসার কারণ ও নতুন ছবির প্রস্তাব সুচিত্রার সামনে রাখতেই মুহূর্তে বদলে যায় আবহাওয়া। ছবির কথা শুনেই কড়া সুর ভেসে আসে সুচিত্রার গলায়—তিনি এই কাজ করবেন না।
স্নেহের দিদিকে একটু বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন সুখেন। আর তাতেই অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন মহানায়িকা। রেগে আগুন হয়ে চিৎকার করে বাড়ির বাইরের দরজা দেখিয়ে সুচিত্রা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “তোমার সাহস কী করে হলো? এখনই বেরিয়ে যাও এই বাড়ি থেকে! কোনওদিন আর এ বাড়িতে পা রাখবে না!”
যার কাছ থেকে স্নেহ ও ভালোবাসা পাওয়ার অভ্যেস ছিল, সেই ‘দিদি’ সুচিত্রা সেনের মুখ থেকে এমন রূঢ় আর অপমানজনক কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যান সুখেন দাস। নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে সেদিন চোখের জলে ভেসে বালিগঞ্জের সেই বাড়ির সিঁড়ি নেমে এসেছিলেন তিনি। ভেঙে গিয়েছিল ভালোবাসার এক পুরনো সম্পর্কের সেতু। এরপর আর কোনওদিন মহানায়িকার বাড়ির চৌকাঠে পা রাখেননি পরিচালক সুখেন দাস।