
অভিনেতা-পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ডিভোর্স না হলেও ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে অভিনেত্রী দেবলীনা দত্তর। কিন্তু তিনি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি তাঁর স্বামীকে। এখনও পর্যন্ত তথাগতকেই আগলে ধরে রয়েছেন মনের মধ্যে। বলেছেন, “তথাগতকে ভালবাসতে হলে আমার তথাগতরই প্রয়োজন, এমনটা নয়।” ব্রেকআপের যন্ত্রণা ভুলতে কখনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জর্জ বার্নার্ড শ, কখনও ভারতীয় স্পিরিচুয়াল গুরু ওশো-র বই পড়েন দেবলীনা। প্রচণ্ড কষ্ট থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মনোচিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করেন নিয়মিত। তিনি ‘মুভ অন’ করতে পারেন না। যে সময় দেবলীনা বড় হয়েছিলেন, সেই সময়টায় হয়তো ‘মুভ অন’ করার রেওয়াজও শুরু হয়নি। জেন জ়েড কিংবা জেন জ়ি-র মতো টুপটাপ রিলেশন স্টেটাস পাল্টে যায়নি তাঁর। সরস্বতী পুজোয় বাঙালির প্রেম কী, তাই নিয়ে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে মান-অভিমান-হারানো প্রেম নিয়ে অনর্গল বলে গেলেন দেবলীনা… কান পেতে শুনল TV9 বাংলা।
দেবলীনার চোখে হাইস্কুল রোম্যান্স
ছোট ছিলাম যখন, ভ্যালেন্টাইনস ডে সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। সরস্বতী পুজোটাই ছিল বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে। খানিকটা আমারও। ওইদিন সাজুগুজু করত হাইস্কুলের ছেলেমেয়েরা। হাইস্কুল রোম্যান্সের পিক এজ (peak age) ছিল সেটা। এই স্কুল, ওই স্কুল যাওয়া-আসাও ছিল। বাড়ি থেকে অনেক ছাড় পেত ছেলেমেয়েরা। অভিভাবকেরা কড়া হতেন না সে দিন ততটা। সিনিয়রদের নজরদাড়ি ছাড়াই পুজোটাকে উপভোগ করত হাইস্কুলের পড়ুয়ারা। ভীষণ পবিত্র এবং মিষ্টি ছিল পুরো বিষয়টা।
হারিয়ে যাওয়া রোম্যান্সে বুকে ব্যথা
আজকের দিনের সরস্বতী পুজো কিন্তু আর আগের মতো নেই। সবকিছুই হয়ে গিয়েছে সোশ্য়াল মিডিয়াকেন্দ্রিক। আমরা ছোটবেলায় এই বিশেষ দিনটার জন্য সারাবছর অপেক্ষা করে থাকতাম। সারাবছর যাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতে ইতস্তত ছিলাম, সরস্বতী পুজোর দিন তাঁর সঙ্গে একটু দৃষ্টি বিনিময় হবে… এই আশায় ৩৬৪ দিন অপেক্ষায় থাকতাম। কিন্তু এখন তো প্রেম-ভালবাসার সংজ্ঞাই পাল্টে গিয়েছে। এখন সবটাই শরীর-সর্বস্ব হয়ে গিয়েছে। এটার কারণ হল মোবাইল ফোন। ইন্টারনেটে এটা-ওটা-সেটা সার্চ করে ছোট থেকেই নানা ধরনের কনটেন্ট দেখে ফেলছে তারা। ফলে রোম্যান্সের পবিত্রতা কিংবা সারল্য হারিয়ে গিয়েছে।
দাদুর টিউশনে প্রেমের পরশ
‘লাভ’ (Love) এবং ‘রোম্যান্স’ বস্তুটা আমি বুঝেছিলাম আমার দাদু টিউশনে। আমার দাদু বিশ্বনাথ গুপ্ত ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার নামকরা শিক্ষক। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতিহাস—এই চারটে বিষয় পড়াতেন। ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। অবসরের পর প্রাইভেট টিউশন পড়াতেন ছেলেমেয়েদের। পথ দুর্ঘনায় পা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে ‘খোঁড়া মাস্টার’ হিসেবে তাঁকে সকলে ডাকতেন। তাঁর টিউশনে যেতাম ছোট থেকেই। উঁচু ক্লাসের দাদা-দিদিদের প্রেম করতে দেখতাম চোখের সামনে। আমাদের ভিসিআর (VCR)-এ ক্যাসেট চালিয়ে সিনেমা দেখার ব্য়বস্থা করে দিয়েছিল দাদুই। সেই প্রথম ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ দেখেছিলাম। এমন প্রেমের ব্যবস্থা বাবা-মায়েরা কি করে দিতে পারতেন সেই সময়ে? অত বিলাশ ছিল তখন? যে ছেলেটিকে ভাল লাগে, তাকে পাশে নিয়ে ‘পহেলা নশা’ উপভোগ করা যেন ছিল ব্রাউনি। আমার প্রথম প্রেমিককেও দাদুর টিউশনে নিয়ে যাই…
দেবলীনার প্রথম প্রেম…
আমার পাড়াতে প্রেম করেছিলাম একটা। সেই ছেলেটিই ছিল আমার প্রথম প্রেমিক। তাঁকে মন দিয়ে দিয়েছিলাম। ৭ বছর সম্পর্কটায় ছিলাম। আমার পরিবার থেকে সম্মতি ছিল সেই প্রেমের। ক্লাস টেনে ওর সঙ্গে ভালবাসা বিনিময় করি। ওকে নিয়ে চলে যাই দাদুর টিউশনে। ৭ দিন ধরে সরস্বতী পুজোর জোগাড় চলত টিউশনে। সেই সাতটা দিন প্রেমেই পড়ে থাকত সকলে। আমার সেই প্রেমিকও যেত। কিন্তু সে আমার অতীত। প্রথম প্রেম বলে ভুলিনি। আমাদের এক অনাবশ্যক কারণে ব্রেক-আপ হয়। তবুও সেই সময়টার সঙ্গে ব্রেক-আপ করতে পারি না আজও। আসলে সময়টাই মনে থাকে, মানুষ ফিকে হয়ে যায়। আমার সেই দাদু আজ নেই। কিন্তু ফেলে আসা বসন্তগুলো সেই টিউশনের আনাচে-কানাচে পড়ে থাকতে দেখি। এখনও, এত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গিয়েও আমার মনে ‘অপ্রচলিত’ ভিসিআরে ভেজে ওঠে ‘পহেলা নশা পহেলা খুমা, নয়া পেয়ার হ্যায়, নয়া ইন্তেজ়ার…’