
রুপোলি পর্দার চিরন্তন ‘কিংবদন্তি’ তিনি। সেই মহানায়ক উত্তম কুমার ব্যক্তিজীবনে ছিলেন গভীর ঈশ্বরবিশ্বাসী। শত ব্যস্ততার মাঝেও সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে পুজো দেওয়া ছিল তাঁর প্রতিদিনের বাঁধাধরা রুটিন। ভবানীপুরের পৈতৃক বাড়ি হোক কিংবা ময়রা স্ট্রিটের বাসভবন— দুই বাড়িরই ঠাকুর ঘরের সর্বময় দায়িত্ব তিনি নিজে সামলাতেন। তাঁর স্বপ্নে পাওয়া গণেশ ঠাকুরের কথা তো সবারই জানা, কিন্তু উত্তর কলকাতার এক বিখ্যাত কালীপুজোর সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত এক আত্মিক টান জড়িয়ে ছিল, যা খুব কম মানুষই জানেন।
উত্তর কলকাতার এক আঁকাবাঁকা গলিতে প্রায় বহু বছর ধরে ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে এক বিশেষ পুজো। ক্লাবের আসল নাম ‘নব যুবক সঙ্ঘ’ হলেও, এই পুজো আজও লোকমুখে পরিচিত ‘ফাটাকেষ্টর পুজো’ নামে। এককালের দাপুটে ও কুখ্যাত ব্যক্তিত্ব কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্টর হাতেই শুরু হয়েছিল এই পুজো। প্রতি বছর এই মণ্ডপে আলো ছড়াতে উপস্থিত হতেন অমিতাভ বচ্চন, রাজেশ খান্না কিংবা বিনোদ খান্নার মতো বলিউডের প্রথম সারির তারকারা। আর মহানায়ক উত্তম কুমার তো নিয়ম করে প্রতি বছর আসতেনই! কথিত আছে, কালীপুজোর ঠিক দিন কয়েক আগে ফাটাকেষ্ট নিজে হাতে মিষ্টির হাঁড়ি ও নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে পৌঁছে যেতেন উত্তমের বাড়িতে। মহানায়কও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন সেই আমন্ত্রণের জন্য। প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, ফাটাকেষ্টর পুজোর মা কালীর কাছে উত্তম কুমার যা মানত করেছিলেন, দেবী দু’হাত উজাড় করে তাঁকে সব দিয়েছেন।
তবে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে মহানায়কের প্রয়াণের ঠিক আগের বছর, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের কালীপুজোয় ঘটেছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। উত্তমকুমার সেদিন মণ্ডপে দাঁড়িয়ে যা বলেছিলেন, তা শুনে শিউরে উঠেছিলেন উপস্থিত সবাই। যেন কোনও এক দৈব সঙ্কেতে তিনি আগেভাগেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন, সেই কালীপুজোই তাঁর জীবনের শেষ দেবী দর্শন হতে চলেছে!
সেই সময়ের একটি জনপ্রিয় বিনোদন পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের দীপাবলিতে যথারীতি সময়মতো ফাটাকেষ্টর পুজোয় হাজির হন মহানায়ক। গলির মুখে গাড়ি থামতেই তাঁকে একঝলক দেখার জন্য থিকথিক করছিল ভিড়। জনতার ঢল পেরিয়ে উত্তম সোজাসুজি চলে যান দেবী প্রতিমার ঠিক সামনে। আর ঠিক তখনই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! দেবীর মুখোমুখি দাঁড়াতেই মহানায়কের দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জল। পাশে দাঁড়িয়ে তখন স্তব্ধ ফাটাকেষ্ট ও উত্তমের ম্যানেজার।
চোখের জল মুছতে মুছতে একটু উচ্চস্বরেই উত্তম বলে ওঠেন, “মা গো, তুমি আমাকে জীবন উজাড় করে সব দিয়েছ। আমি তোমার কাছে পরম কৃতজ্ঞ। কিন্তু কেন জানি না মা, আজ আমার ভেতর থেকে মন বলছে— এটাই হয়তো আমার তোমাকে শেষবারের মতো দেখতে আসা! আমাকে শুধু একটু শান্তি দিও মা…”
সেদিন মহানায়কের কণ্ঠে ধরা পড়েছিল এক গভীর হতাশা ও বিষাদের সুর। যিনি বাংলা সিনেমার একছত্র অধিপতি, লক্ষ লক্ষ তরুণীর স্বপ্নের পুরুষ— তাঁর মনে কীসের এত হাহাকার? উপস্থিত ভক্তরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এ কথা শুনে। তবে গাড়ি চড়ে ফেরার আগে অনুগামীদের দিকে তাকিয়ে সেই চিরপরিচিত ভুবনমোহিনী হাসিটা হেসে মহানায়ক শুধু বলেছিলেন, “শুভ দীপাবলি, আবার দেখা হবে…” কিন্তু না, আর দেখা হয়নি। পরের বছরই চিরতরে অন্তরালে চলে যান মহানায়ক, আর স্মৃতি হয়ে থেকে যায় ১৯৭৯ সালের সেই ঐতিহাসিক দীপাবলির রাত।