
বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন তারকা ছিলেন না, ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই ‘মহানায়ক’। রুপোলি পর্দায় তাঁর মোহময় উপস্থিতি, সম্মোহনী হাসি আর নিজস্ব স্টাইল যুগে যুগে লক্ষ লক্ষ নারীহৃদয়ে তোলপাড় তুলেছে। আজও প্রেক্ষাগৃহ কিংবা দূরদর্শনের পর্দায় তিনি ভেসে উঠলেই অনুরাগীদের মন নিমেষেই জয় করে নেন। তিনি উত্তম কুমার। অভিনয় শৈলী থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক-আশাক থেকে জীবনদর্শন— আজও বাঙালি দর্শক তাড়িয়ে তাড়িয়ে তা উপভোগ করে।
পর্দায় তৎকালীন সময়ের একাধিক প্রথম সারির অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর অনবদ্য কেমিস্ট্রি জমাট বাঁধলেও, রোম্যান্সের যে চিরন্তন সংজ্ঞা তিনি তৈরি করেছিলেন তা এক এবং অনন্য— উত্তম-সুচিত্রা। যুগের পর যুগ পেরিয়েও এই জুটির ম্যাজিক আজও অমলিন। এই দুই কিংবদন্তির অফ-স্ক্রিন রসায়ন নিয়ে চর্চার অন্ত ছিল না। তাঁদের বন্ধুত্ব থেকে শুরু করে গোপন প্রেম বা পরকীয়ার বহু গুঞ্জন ডালপালা মেলেছিল টালিগঞ্জের অন্দরে। কিন্তু জল্পনা যাই থাকুক না কেন, উত্তম-সুচিত্রাকে এক ফ্রেমে দেখার জন্য মুখিয়ে থাকতেন অগণিত অনুরাগী।
তবে এই কালজয়ী পথচলা হুট করেই এক চরম ট্র্যাজেডিতে থমকে যায়। শুটিং সেটে আচমকাই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন মহানায়ক। তড়িঘড়ি তাঁকে বাড়িতে এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে উত্তম কুমার একটিই শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন— তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে সুচিত্রা সেনকে একবার চোখের দেখা দেখতে চান। মহানায়কের এই আকুল আর্জি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল সুচিত্রা সেনের কাছেও।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, প্রিয় সখার সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ হতে পারেনি। সেই সময় অত্যন্ত ব্যস্ত শুটিং শিডিউলে আটকে থাকার কারণে তৎক্ষণাৎ মহানায়কের পাশে এসে পৌঁছাতে পারেননি ‘রমা’ অর্থাৎ সুচিত্রা সেন। তিনি যখন সময় বের করতে পারলেন, ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। সেই ঘটনার মাত্র সাত দিনের মাথায় চিরতরে চোখ বুজলেন মহানায়ক। অপূর্ণই থেকে গেল এক কিংবদন্তির শেষ চাওয়া।
উত্তম কুমারের এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণের পর নিজেকে একেবারেই বদলে ফেলেছিলেন সুচিত্রা সেন। ধীরে ধীরে রূপোলি জগতের আলো-ঝলমলে পরিবেশ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন তিনি। শুরু হয় তাঁর সুদীর্ঘ অন্তরাল জীবন। আত্মীয় ও অতি ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া বাইরের পৃথিবীর কারও সঙ্গেই আর দেখা করতেন না তিনি। বিনোদন জগতের ইতিহাসবিদদের মতে, মহানায়কের অকাল প্রয়াণ ও শেষ দেখা না হওয়ার সেই গূঢ় অভিমানী স্মৃতি সুচিত্রা সেনকে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে অন্যতম বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।