
স্বপ্নে স্বয়ং গণেশের দেখা পেয়েছিলেন, তাই আজীবন অত্যন্ত জাঁকজমক করে গণেশ পুজো করতেন মহানায়ক উত্তম কুমার। ঠিক তেমনই টলিপাড়ার মহাতারকার ভবানীপুরের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো চালুর ইতিহাসও কম রোমাঞ্চকর নয়। স্ত্রী গৌরীদেবীর মুখের আদলে তৈরি প্রতিমাতেই আজও সেখানে হয় মা লক্ষ্মীর আরাধনা। এই ঐতিহ্য ও ইতিহাস অনেকেরই জানা। তবে জানেন কি, লোকবিশ্বাস ও শাস্ত্রের গণ্ডি পেরিয়ে মহানায়ক তাঁর বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোয় এমন এক নিয়ম ভেঙেছিলেন, যা আজও এক অনন্য ব্যতিক্রম?
পুরাণ অনুযায়ী, মা লক্ষ্মী অত্যন্ত ‘চঞ্চলা’। তাই তাঁকে ঘরে স্থায়ী করতে শান্ত ও স্থির পরিবেশের প্রয়োজন হয়। শাস্ত্র বলে, লক্ষ্মীপুজোয় শঙ্খ বাজলেও কাসর কিংবা ঘণ্টা বাজানো নিষিদ্ধ বা বর্জনীয়, কারণ অতিরিক্ত কোলাহল বা শব্দ মা লক্ষ্মীর পছন্দ নয়। প্রায় প্রতিটি বাঙালি পরিবারেই এই নিয়ম নিষ্ঠা করে মানা হয়। কিন্তু উত্তম কুমার নিজের বাড়িতে এসে এই চিরাচরিত নিয়মের বদল ঘটিয়েছিলেন!
উত্তম কুমারের ভবানীপুরের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো শুরু হয় ১৯৫০ সালে— যে বছর মহানায়কের পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। সেই প্রথম বছর থেকেই উত্তমের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোয় ঢাক বাজানোর রেওয়াজ চালু হয়, যা আজও সমানভাবে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মহানায়ক?
উত্তম কুমার অনুভব করতেন, দেবী দুর্গার বিদায়ের পর বিজয়া দশমীর রেশ কাটতে না কাটতেই গোটা বাংলা জুড়ে এবং মানুষের মনে এক বিষাদের ছায়া নেমে আসে। দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পর চারপাশের সেই শূন্যতা ও মনখারাপ তাঁকে বেশ ভাবাত। মানুষের মনের সেই অবসাদ ও বিষণ্ণতা দূর করতেই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় ঢাক বাজানোর অভিনব সিদ্ধান্ত নেন তিনি। মহানায়কের বিশ্বাস ছিল, ঢাকের আওয়াজে চারপাশের সেই মনখারাপ যেমন দূর হবে, তেমনই মা লক্ষ্মীও আনন্দিত হবেন।
উত্তমের সেই ব্যক্তিগত আবেগ ও ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েই আজও মহানায়কের সেই পৈতৃক বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোয় ঢাকের বাদ্যে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। পুজোর আচার-আচরণে লোকরীতির এই অসামান্য মেলবন্ধন আজও উত্তম পরিবারের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে।