
উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন—বাংলা সিনেমার ইতিহাসের এক কালজয়ী জুটি। রুপোলি পর্দায় তাঁদের রসায়ন যেমন রোমাঞ্চ তৈরি করত, তেমনই পর্দার বাইরেও তাঁদের সম্পর্ক ঘিরে চর্চার শেষ ছিল না সেকালের বিনোদন ম্যাগাজিনগুলোতে। এই চর্চার সমীকরণে প্রায়শই টেনে আনা হত অভিনেত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরীকেও। কিন্তু গুঞ্জনপাড়ার এই মুখরোচক গল্পগুলোর নেপথ্যে আসল সত্যিটা ঠিক কী ছিল? মহানায়ক উত্তম কুমার, মহানায়িকা সুচিত্রা সেন এবং সুপ্রিয়া দেবীর পারস্পরিক সম্পর্কের সেই অজানা ও দুর্লভ অধ্যায় নিজের আত্মজীবনীতে উন্মোচন করেছিলেন খোদ সুপ্রিয়া দেবী।
সুপ্রিয়া দেবীর লেখনিতে ফুটে ওঠে এক অন্য সুচিত্রা সেনের ছবি। ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে যিনি ‘রাশভারি ম্যাডাম সেন’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দারুণ রসিক এবং প্রাণবন্ত এক মানুষ। আর সেই রসিকতার স্বাদ সবচেয়ে ভালো পেতেন উত্তম ও সুপ্রিয়া নিজেই। সুপ্রিয়া দেবী স্পষ্ট লিখেছিলেন, সুচিত্রার সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে উঠেছিল উত্তমের সূত্র ধরেই, আর উত্তম-সুচিত্রার সম্পর্কের মূল ভিত্তিটাই ছিল এক পরম সরলতা ও গভীর বন্ধুত্ব।
আত্মজীবনীতে সুপ্রিয়া দেবী একটি অভাবনীয় ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছিলেন। তখন ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে উত্তম কুমারের সঙ্গেই থাকতেন সুপ্রিয়া। একদিন কাকভোরে হঠাৎ ফোন বাজে। ফোন ধরতেই ওপার থেকে ভেসে আসে সুচিত্রা সেনের গলা। সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, “উতু (উত্তম কুমারকে ভালোবেসে এই নামেই ডাকতেন সুচিত্রা) আছে?”
সুপ্রিয়া দেবী জানান, উত্তম তখন বাড়িতে নেই। তা শুনেই ওপার থেকে সুচিত্রার চিরপরিচিত চটুল রসিকতা, “ইসস, উতুকে খুব চুমু খেতে ইচ্ছা করছে তো!”
এমন কথা শুনে সাধারণ কোনও নারী চমকে উঠলেও সুপ্রিয়া দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হেসে উত্তর দেন, “বেশ তো! আমি স্টুডিওতে ফোন করে বলে দিচ্ছি, শুটিং শেষ করেই যেন ও তোমার বাড়ি চলে যায়। তুমি মন ভরে চুমু খেয়ে নিও!”
সুপ্রিয়ার এই সহজ ও সপাট জবাবে উল্টে সুচিত্রাই হতবাক হয়ে যান। বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করেন, “একী, তোর হিংসা হচ্ছে না?”
সুপ্রিয়া হেসে জবাব দিয়েছিলেন, “না, কারণ আমি তোমাকে খুব ভালো করেই চিনি রমাদি। তোমার মিষ্টি দুষ্টুমি আর রসিকতার ধরনটাও আমার জানা আছে।”
সুপ্রিয়া দেবী লিখেছেন, উত্তম ও সুচিত্রা সেনের বন্ধুত্বে কোনও রাখঢাক ছিল না। শুটিং ফ্লোরে গম্ভীর থাকলেও আড্ডায় বসলে দুজনের হাসির রোল উঠত। সুচিত্রা সেন প্রায়শই তাঁদের ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে এসে আড্ডা দিতেন, সুপ্রিয়া দেবীও তাঁর প্রিয় পদ রেঁধে খাওয়াতেন। আবার কখনও কখনও সুচিত্রার নিজস্ব বাসভবনেও ডাক পড়ত উত্তম-সুপ্রিয়ার।
তবে বলিপাড়া বা টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় তাঁদের এই ত্রিভুজ বন্ধুত্বের সমীকরণ সবসময় গোপনই রাখা হতো। সুচিত্রা সেন বিশ্বাস করতেন, তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন যদি সর্বসমক্ষে চলে আসে, তবে তাঁদের ঘিরে থাকা সেই রহস্যময় মায়াজাল বা ‘ম্যাজিক’ এক নিমেষে উবে যায়। গোপনীয়তার সেই মায়াজালেই বন্দি থেকে আজও সমান উজ্জ্বল বাংলা চলচ্চিত্রের এই তিন প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্রের বন্ধুত্বের অমলিন গল্প।