
শিরোনামে নাম আসা মাত্রই এখন তটস্থ থাকে গোটা বলিউড থেকে শুরু করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল। নাম তাঁর লরেন্স বিষ্ণোই (Lawrence Bishnoi)। বর্তমানে ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীদের তালিকার শীর্ষস্থানে থাকা এই গ্যাংস্টারকে নিয়ে জল্পনার অন্ত নেই। একদিকে কুখ্যাত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, আর অন্যদিকে কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা কারাগারের সেল— সব মিলিয়ে এক আক্ষরিক অর্থেই রহস্যময় চরিত্র তিনি। কিন্তু কে এই লরেন্স বিষ্ণোই? সাধারণ এক ছেলে থেকে থেকে কীভাবে তিনি দেশের অন্যতম ভয়ঙ্কর অপরাধজগতের ডন হয়ে উঠলেন এবং কারাগারের ভেতরে বসে কীভাবে নিপুণ হাতে এত বড় অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন?
পঞ্জাবের ফাজলকা জেলার দুতারানওয়ালি গ্রামের এক সচ্ছল জাট শিখ পরিবারে জন্ম লরেন্স বিষ্ণোইয়ের (আসল নাম বলকরণ সিং)। তাঁর বাবা ছিলেন হরিয়ানা পুলিশের এক কনস্টেবল। ছোটবেলা থেকেই বিলাসবহুল জীবন কাটানো লরেন্স উচ্চশিক্ষার জন্য চণ্ডীগড়ে আসেন এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
ঠিক এখানেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ২০১০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের রাজনীতিতে পা রাখেন লরেন্স। অপরাধ জগতের সমান্তরালে চলা ছাত্র ইউনিয়নের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন তিনি। অস্ত্র প্রদর্শন, মারপিট এবং নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নাম জড়ানোর মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে অপরাধের অন্ধকার দুনিয়ায় তাঁর হাতেখড়ি হয়। এরপর একে একে অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং পঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও চণ্ডীগড়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, তোলাবাজি ও গ্যাংওয়ারের মামলা দায়ের হতে শুরু করে।
কীভাবে গ্যাংস্টার হয়ে উঠলেন লরেন্স?
বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ধর্মানুসারী লরেন্স বরাবরই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রতি গোঁড়া ছিলেন। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালে ঘটে যাওয়া কৃষ্ণসার হরিণ হত্যা মামলা এবং সেই ঘটনায় অভিনেতা সলমন খানের নাম জড়ানো লরেন্সকে তীব্রভাবে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এই একটিমাত্র ইস্যুই তাঁর অপরাধ জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিষ্ণোই সমাজের চোখে সলমন ‘অপরাধী’, আর তাঁকে শিক্ষা দেওয়াই যেন জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় লরেন্সের।
ছোটবেলার বন্ধু গোল্ডি ব্রারকে সঙ্গে নিয়ে ক্রমশ ছোট ছোট অপরাধের চক্রকে বড় করে লরেন্স। কুখ্যাত গ্যাংস্টার বিক্রমজিৎ সিং ওরফে ভিকি মিডুলেখার সঙ্গে হাত মিলিয়ে উত্তর ভারতজুড়ে এক বিশাল অপরাধ সিন্ডিকেট গড়ে তোলে সে। কানাডা, আমেরিকা এবং ইউরোপে বসে থাকা কুখ্যাত অপরাধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে লরেন্স। বর্তমানে দুর্ধর্ষ শুটারদের নিয়ে তৈরি তাঁর এই গ্যাংয়ে প্রায় ৭০০ জনেরও বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে বলে পুলিশের অনুমান।
কীভাবে চলছে এই বিষ্ণোইয়ের অপরাধ সাম্রাজ্য?
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন হাই-সিকিউরিটি জেলের ভেতরে বন্দি থাকা সত্ত্বেও লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অপরাধ সাম্রাজ্য এক বিন্দুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং তা আরও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু জেলের কঠোর নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেদ করে কীভাবে গ্যাং পরিচালিত হয়? তদন্তকারীদের সূত্রে জানা যায় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য:
১.জেলের ভিতর থেকে বাইরের আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং নিজস্ব শ্যুটারদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত ও এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ (যেমন Signal, WhatsApp, Telegram) ব্যবহার করা হয়। এমনকি জেলের ভেতর বেআইনিভাবে ছোট স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ করে দেয় গ্যাংয়ের অনুগামীরা।
২. লরেন্স সরাসরি নিজে ফোন ব্যবহার না করলেও তাঁর হয়ে কানাডা বা আমেরিকার মতো দেশ থেকে পুরো গ্যাং পরিচালনা করে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। জেল থেকে পরিজন বা আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বা কোর্টে যাতায়াতের ফাঁকে নির্দেশ পৌঁছে যায় নিচের স্তরে।
৩. লরেন্স গ্যাংয়ের অন্যতম বড় কৌশল হল অপরাধ সংগঠিত করার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে তার দায় স্বীকার করা। এর ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয় এবং এক্সটরশন বা তুলনামূলক তোলাবাজি সহজ হয়ে যায়।
৪. অপরাধ জগতে টাকা কামানোর জন্য গ্যাংটি মূলত হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের বেকার ও অপরাধপ্রবণ তরুণদের অর্থের লোভ দেখিয়ে নিজেদের দলে টানে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে হরিয়ানা বা মধ্যপ্রদেশ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে তারা নির্দিষ্ট টার্গেটে আঘাত হানে।
সলমন খানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে হামলা বা কুখ্যাত রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ড, সম্প্রতি টাইগার শ্রফের উপর হামলার মতো ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে, জেলের চার দেওয়াল লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অপরাধের হাতকে কোনওভাবেই আটকাতে পারেনি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাদের চোখে চোখ রেখে কারাগারের ভেতরে বসেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এই গ্যাংস্টার এখন দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।