
বাংলা ছায়াছবির স্বর্ণযুগে দুই কিংবদন্তির পথ চলা নিয়ে সিনেমাপ্রেমীদের কৌতূহলের অন্ত নেই। এক মেরুতে সেলুলয়েডের জাদুকর সত্যজিৎ রায়, আর অন্য মেরুতে বক্স অফিসের একচ্ছত্র অধিপতি ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমার। ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’র মতো ছবির পর সত্যজিতের পরিচালনায় উত্তম ম্যাজিক আর রুপোলি পর্দায় ধরা দেয়নি। পরিচালকের প্রায় প্রতিটি ছবিতেই তখন নিয়মিত মুখ হয়ে উঠছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ইন্ডাস্ট্রির এই সমীকরণ বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও, মহানায়কের মনের অন্দরে কোথাও একটা জমে ছিল সুপ্ত অভিমান। সত্যজিতের মাত্র দুটি ছবিতে কাজ করার আক্ষেপটা তিনি আর চেপে রাখতে পারেননি। সরাসরি পরিচালককে সেই অনুযোগ জানিয়ে যে জবাব তিনি পেয়েছিলেন, তা এককথায় হতবাক করে দিয়েছিল উত্তমকে।
সময়টা ১৯৭৮ সাল। টলিউড তখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্টুডিওপাড়ায় একের পর এক ফ্লোরে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের জেরে শিকেয় উঠেছে সিনেমার শুটিং। এই নাভিশ্বাস ওঠা সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গাড়ি চেপে নবান্নের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় ও উত্তম কুমার।
চলন্ত গাড়ির কাচ ভেদ করে কলকাতার রোদ তখন অন্দরে এসে পড়েছে। আর সেই নীরব মুহূর্তে বহুদিনের জমে থাকা চাপা অভিমান আর ধরে রাখতে পারেননি মহানায়ক। সত্যজিতের দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি জানতে চান, “আচ্ছা মানিকদা, আপনি কিন্তু আমাকে আর কোনও ছবিতে নিচ্ছেন না। কেন বলুন তো?” উত্তমের এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নে প্রথমে খানিকটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ।
মুহূর্তের জন্য নীরবতা ভেঙে সত্যজিৎ অত্যন্ত শান্ত ও নির্বিকার গলায় উত্তর দেন, “দেখো উত্তম, তোমার বয়সটা এখন এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে তুমি পুরোপুরি যুবকও নও, আবার প্রবীণও হয়ে ওঠোনি। আরেকটু বয়স হোক, পাকা চুল আসুক, তখন তোমাকে নিয়ে ফের নতুন কোনও ছবি করব।”
কিন্তু সত্যজিতের এই যুক্তি সহজে হজম করতে পারেননি আত্মসম্মানে বলীয়ান মহানায়ক। পরিচালকের মুখের ওপর স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দেন, “থাক মানিকদা, বুড়োর চরিত্র আমার আর করতে হবে না! ওই বয়স্ক চরিত্রগুলো বরং সৌমিত্রই করুক।”
সত্যজিতের সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক আলাপচারিতার ঠিক দু’বছর পরেই, ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই আকস্মিক প্রয়াণে চিরতরে থেমে যায় মহানায়কের কণ্ঠ। পরবর্তীকালে অনেকেরই বিশ্বাস ছিল, উত্তম কুমার যেন নিজের অবচেতন মনেই টের পেয়েছিলেন তাঁর জীবনের ঘড়ির কাঁটা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সত্যজিতের কথামতো সত্যিই আর বৃদ্ধ বয়সের চরিত্রে রূপদান করার সময় পাননি তিনি। মহানায়কের সেই ক্ষোভ, আভিজাত্য আর সত্যজিতের সেই না-বলা অপেক্ষা—সবকিছুই চিরকালের মতো জমা হয়ে রইল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পাতায়।