
‘থ্রি ইডিয়টস’-এ জয় লোবোকে মনে আছে? বীরু সাহাস্ত্রেবুদ্ধে ওরফে ‘ভাইরাস’ যখন জয়ের প্রজেক্টকে বাতিল করে দেয়, মনের দুঃখে সে গান গেয়েছিল ‘Give me some sunshine’. আর এই গানের পর জয় বেছে নিয়েছিল মৃত্যুর পথ। আত্মঘাতী হয়েছিল সে। জয় লোবোর মতো উদাহরণ এই দুনিয়ায় কম নয়। প্রেমে ব্যর্থতা, সাংসারিক অশান্তি, ঋণের দায়—এই ধরনের ঘটনায় মানুষ আত্মঘাতী হন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনাও এদেশে নতুন নয়। NCRB (ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো) ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ অ্যান্ড সুইসাইড ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন যত সংখ্যক মানুষ, তার মধ্যে প্রায় ৫০-৬০% আত্মহত্যাই নাবালক-নাবালিকা।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা NCRB ২০২২-এর যে তথ্য সম্প্রতি প্রকাশ্যে এনেছে, তাতে ১৮ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে অবনতির ছবিই উঠে এসেছে। গত ৫ বছরের তথ্য দেখলে বোঝা যাবে, ২০১৮ সালে ১,৫২৯ জন, ২০১৯ সালে ১,৫৭৭ জন, ২০২০ সালে ১,১২৯ জন, ২০২১ সালে ৮৬৪ জন এবং ২০২২ সালে ১,১২৩ জন ১৮ বছরের কম বয়সি ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যা করেছে। ২০২০ আর ২০২১-এ অনলাইনে পরীক্ষা হয়েছে, তাই অন্য বছরের তুলনায় এই দুই বছরে আত্মহত্যার সংখ্যাটা কম। কিন্তু সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
‘পরীক্ষায় পাশ করতে পারিনি’, ‘বাবা-মা কী বলবে’, ‘কোনও ভাল কলেজে চান্স পাব না’, ‘কেরিয়ার শেষ’—এই ধরনের নানা চিন্তা চলতে থাকে কৈশোর শেষ করে যৌবনে পা-দেওয়ার আগের মুহূর্তে থাকা তরতাজা প্রাণ। এখান থেকেই কি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় কিশোর-কিশোরীরা? এই প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হয় ইনস্টিটিউট অফ সাইকায়াট্রি (IPO)-র শিক্ষক-চিকিৎসক তথা ইন্ডিয়ান সাইকিয়াট্রিক সোসাইটি-র সুইসাইড প্রিভেনশন সেল-এর কো-অর্ডিনেটর সুজিত সরখেলের সঙ্গে। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, পরীক্ষার চাপ বা exam phobia-কে কেন্দ্র করে আত্মহত্য়ার চেষ্টা বা আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে চলার পিছনে কোন-কোন কারণ বা factor রয়েছে বলে মনে হয়?
সুজিত সরখেলের কথায়,
“Exam Phobia-কে কেন্দ্র করে আত্মহত্য়ার চেষ্টা বা আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে চলার পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। ‘Exam Phobia’ শব্দটা যদি না-ও ব্যবহার করা হয়, পরীক্ষার প্রতি ভীতি অথবা পরীক্ষায় কী ফল বেরোবে, সেটা নিয়ে যে ভয় বা অ্যানজ়াইটি, সেটা নিয়ে অনেকের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একটা হল, পরীক্ষার আগে ভয়, পরীক্ষা না দেওয়া, অসুস্থ হয়ে পড়া, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া ইত্যাদি। আর একটা হচ্ছে, পরীক্ষা দেওয়া পর যেই রেজাল্ট বের হল, তখন রেজাল্ট প্রত্যাশিত না-হওয়ায় তার জন্য যে কিছু-কিছু মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে বা আত্মঘাতী হচ্ছে, এর পিছনে একটা কারণ দায়ী। ছোটবেলা থেকে যে মাথার ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যদি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হও অথবা তুমি যদি যথেষ্ট পরিমাণে সাফল্য না পাও বা অন্যদের তুলনায় ভাল ফল না করতে পার, তাহলে বাস্তবে তুমি না খেতে পেয়ে মরবে। আদতে তুমি অপদার্থ। সেটা পরিবারের চোখে বা নিজের চোখেও হতে পারে। এটাই মাথায় ঢোকানো হয় যে, প্রত্যাশিত ফল না পেলে কেরিয়ারে সাফল্য পাবে না। একটা বাচ্চার মাথায় ছোট থেকে যদি এগুলোই ঢোকানো হয়, তার অবচেতন মন এটাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেয়। তার মনে হয়, একটা পরীক্ষায় খারাপ ফল তার আগামী জীবনের সবকিছুকে নষ্ট করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে যখন তার পরীক্ষার ফলাফল দেখছে, তখন তার মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। আমাদের মধ্যে এই যে প্রথাগত চিন্তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, যা পরীক্ষার প্রতি ভয় এবং ফলাফল আত্মহত্যা রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।”