
নয়াদিল্লি: ট্র্যাফিক সিগন্যালে ঠেলাগাড়িতে সবজি বিক্রি করেন এক ব্যক্তি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করুন, তিনি কী করেন? উত্তর দেবেন, নিজের কাজ করেন। একই প্রশ্ন যদি কোনও সরকারি সমীক্ষাকে করা হয়, তা-ও একই উত্তর দেবে। ওই ব্যক্তিকে কর্মরত হিসেবেই গণ্য করা হবে। প্রযুক্তিগতভাবে এই হিসেব ঠিক। কিন্তু বাস্তবে এর আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঢাকা পড়ে যায়।
ভারতের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রধান সমীক্ষা, পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS) অনুযায়ী, নির্দিষ্ট এক সপ্তাহের মধ্যে মাত্র এক ঘণ্টা কাজ করলেও একজনকে কর্মরত হিসেবে গণ্য করা হয়। পরিবারের খামার বা দোকানে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করলেও তিনি এই তালিকায় জায়গা পান। এই পদ্ধতি সমীক্ষার কোনও ত্রুটি নয়। বিভিন্ন দেশের কর্মসংস্থানের তুলনা করার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এর ফলে কর্মসংস্থানের গুণমান সম্পর্কে বিশেষ কিছু না জানিয়েও ভারতের কর্মসংস্থানের সামগ্রিক পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক দেখাতে পারে।
আমরা কি কর্মসংস্থান মাপছি নাকি কর্মসংস্থানের গুণমান?
এমন একটি পরিসংখ্যান রয়েছে, যা শুনে যে কারও একবার থমকে যাওয়া উচিত। ভারতে কর্মরত মানুষের প্রায় ৯০ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। অর্থাৎ, তাঁদের অধিকাংশেরই সেই সুযোগ-সুবিধাগুলি নেই, যেগুলির কথা ভাবলে সাধারণত একটি প্রকৃত চাকরির ছবি চোখে ভেসে ওঠে। যেমন—লিখিত নিয়োগপত্র, বেতন-সহ ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডে নিয়োগকর্তার অবদান কিংবা কাজ হঠাৎ চলে গেলে কোনও ধরনের সুরক্ষা।
এই মানুষদের অনেকেই নামমাত্র স্বনিযুক্ত। কেউ ছোট একটি দোকান চালান, কেউ ভাড়ার অটো চালান, কেউ সামান্য জমিতে চাষ করেন, আবার কেউ ঠেলাগাড়িতে জিনিসপত্র বিক্রি করেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের আয় এতটাই কম যে, কোনও রকমে সপ্তাহটা কাটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলে, অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে ভরসা করার মতো কোনও সঞ্চয় বা বিকল্প ব্যবস্থা তাঁদের হাতে থাকে না।
তাই যখন আমরা প্রশ্ন করি, ভারত কি ‘কর্মসংস্থান তৈরি করছে’, তখন আসলে আমরা একই সঙ্গে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি। আর সেই দুই প্রশ্নের উত্তরকে গুলিয়ে ফেলছি।
প্রথম প্রশ্নটি হল, মানুষ কোনও না কোনওভাবে কাজ খুঁজে পাচ্ছেন কি না এবং কিছুটা আয় করতে পারছেন কি না। এই মাপকাঠিতে অধিকাংশ ভারতীয় কোনও না কোনওভাবে, বেশির ভাগ সময়ই কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। একেবারেই কোনও কাজ না থাকা—অর্থাৎ কঠোর অর্থে বেকারত্ব—কখনওই ভারতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল না।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হল, মানুষ এমন কোনও স্থায়ী ও পর্যাপ্ত বেতনের কাজ পাচ্ছেন কি না, যা তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা নিরাপত্তা দিতে পারে। এই মাপকাঠিতে ছবিটা অনেকটাই অস্বস্তিকর। লিখিত চুক্তি ছাড়া কর্মরত কাউকে কোনও আগাম নোটিস ছাড়াই কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। প্রভিডেন্ট ফান্ডে সঞ্চয় না থাকলে বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তা প্রায় থাকে না বললেই চলে। আর যাঁরা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন, তাঁরা যত ঘণ্টাই পরিশ্রম করুন না কেন, তাঁদের নির্দিষ্ট আয় থাকে না, যার ভিত্তিতে পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা সম্ভব।
কাজ থাকা আর আর্থিক নিরাপত্তা থাকার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
পরিবারের কোনও বিয়ের অনুষ্ঠানকে উদাহরণ হিসেবে ধরুন। এমন একটি সাধারণ ঘটনা দিয়েই কাজ থাকা আর আর্থিক নিরাপত্তা থাকার মধ্যে পার্থক্যটা বোঝা যায়। নিয়মিত বেতন পান এবং বেতন-সহ ছুটির সুযোগ রয়েছে, এমন কোনও কর্মী পরিবারের বিয়ের জন্য কয়েক দিন ছুটি নিতে পারেন। তাতে তাঁর আয় বন্ধ হবে না। কিন্তু দৈনিক মজুরিতে কাজ করা কোনও ব্যক্তি একই কারণে কয়েক দিন কাজে না গেলে, তাঁর সেই দিনগুলির মজুরি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে তিনি বিয়েতে যোগ দেবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তটিও নিঃশব্দে একটি আর্থিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
এই কারণেই কিছু অর্থনীতিবিদ এখন ‘বেকারত্ব’ শব্দটির চেয়ে ‘অপ্রতুল কর্মসংস্থান’ (Underemployment) এবং ‘অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান’ (Informality)—এই শব্দগুলির উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ, বাস্তবে কী ঘটছে, তা এই শব্দগুলি আরও ভালোভাবে তুলে ধরে।
একটি দেশে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করতে পারেন, অথচ সেই দেশেই এমন চাকরির ঘাটতি থাকতে পারে, যার উপর ভরসা করে একটি পরিবার আগামী বছরের পরিকল্পনা করতে পারে, এমনকী পরবর্তী দশকের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে, স্বনিযুক্ত হয়ে কাজ করা বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করার মধ্যে কোনও মর্যাদা বা মূল্য নেই। বহু ক্ষুদ্র উদ্যোগপতি এই পথেই সফল হয়েছেন এবং নিজেদের জীবিকার জন্য প্রকৃত নিরাপত্তা গড়ে তুলেছেন। উদ্বেগের বিষয় অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের অস্তিত্ব নয়। বরং উদ্বেগের কারণ হল, এই ধরনের কাজের বিপুল আধিক্য এবং ভারতের কর্মরত মানুষের বিশাল অংশের কাছে এটি একাধিক সম্ভাব্য পথের মধ্যে একটি বিকল্প না হয়ে কার্যত একমাত্র পথ হয়ে রয়ে গিয়েছে। অথচ অন্যদিকে, প্রকৃত আর্থিক নিরাপত্তা দেয় এমন কাজের সুযোগও থাকা উচিত।
আমরা কি যথেষ্ট এমন কর্মসংস্থান তৈরি করছি, যার উপর ভরসা করে মানুষ ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন?
যে অর্থনীতি মানুষকে শুধু ব্যস্ত রাখে, আর যে অর্থনীতি মানুষকে নিরাপত্তা দেয়—এই দুটির মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য রয়েছে। গত কয়েক দশকে ভারত প্রথম কাজটি করতে উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের কর্মসংস্থান গড়ে তোলা এখনও দেশের সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে কম আলোচিত এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবসম্পন্ন অসমাপ্ত কাজগুলির মধ্যে অন্যতম।
পরের বার যখনই কর্মসংস্থানের কোনও পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হবে, তা আশাব্যঞ্জক হোক বা উদ্বেগজনক, তখন হয়তো শুধু ‘কত মানুষ কাজ করছেন’—এই প্রশ্ন না করে আরও একটু নির্দিষ্ট একটি প্রশ্ন করা দরকার।
বরং জানতে চাওয়া উচিত, তাঁদের মধ্যে কতজন নিজেদের কাজের উপর প্রকৃত ভরসা রেখে আগামী এক বছরের পরিকল্পনা করতে পারেন? কতজনের সেই আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে, তাঁদের জীবিকা আগামী দিনেও তাঁদের পাশে থাকবে?
সূত্র: পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS), ভারত সরকারের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রক—সমীক্ষার পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট সপ্তাহে কর্মসংস্থান নির্ধারণের সংজ্ঞা; ডেটা ফর ইন্ডিয়া—ভারতের অসংগঠিত ক্ষেত্রের আকার সংক্রান্ত বিশ্লেষণ; ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪—আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (IHD)।