
উত্তর প্রদেশে পিওন পদে ৬২টি শূন্যপদের জন্য একবার বিজ্ঞাপন দিয়েছিল রাজ্য সরকার। এই চাকরির জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল পঞ্চম শ্রেণি পাশ। মূলত অফিসের বিভিন্ন কাজ করা এবং এক দফতর থেকে অন্য দফতরে ফাইল নিয়ে যাওয়াই ছিল এই পদের কাজ।
কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হল, মাত্র ৬২টি পদের জন্য আবেদন করেছিলেন ৯৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩,৭০০ জন ছিলেন পিএইচডি (PhD) ডিগ্রিধারী। পাশাপাশি আবেদনকারীদের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার জনের কাছে ছিল স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।
একবার বিষয়টি ভেবে দেখুন। যাঁরা কোনও একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণা করতে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন, সেই পিএইচডি (PhD) ডিগ্রিধারীরাও এমন একটি চাকরির জন্য আবেদন করছেন, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা বলতে মূলত প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাই যথেষ্ট।
এটা সেই আবেদনকারীদের বোকামির গল্প নয়। একইভাবে পিওনের চাকরিকে ছোট করে দেখার বিষয়ও নয়। বরং এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ভারতে একটি ডিগ্রির অর্থ ধীরে ধীরে কীভাবে বদলে যাচ্ছে। একসময় যে ডিগ্রিকে ভালো চাকরির গ্যারান্টি বলে মনে করা হত, এখন আর তা সবসময় সেই নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিতে পারছে না।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল—মন দিয়ে পড়াশোনা করো, ডিগ্রি অর্জন করো, তাহলেই একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। একটা সময় পর্যন্ত এই ধারণা অনেকটাই কার্যকর ছিল। কারণ তখন দেশে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অন্যদিকে, অর্থনীতিতে এমন পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি হচ্ছিল, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়ার সুযোগ ছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। গত কয়েক দশকে ভারতে ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়া অবশ্যই একটি বড় সাফল্য। কিন্তু সেই অনুপাতে স্থায়ী, নিরাপদ এবং ভালো বেতনের চাকরির সংখ্যা বাড়েনি।
ফলে তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা। যখন একটি নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সেই যোগ্যতার উপযুক্ত চাকরির সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন শুধু ডিগ্রি থাকলেই আর চাকরি পাওয়া যায় না। বরং একই ডিগ্রিধারী হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। অর্থাৎ যে ডিগ্রি একসময় চাকরি পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হত, সেটিই এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার প্রবেশপত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘ক্রেডেনশিয়াল ইনফ্লেশন’ (Credential Inflation)। উত্তর প্রদেশের পিওন নিয়োগের ঘটনা তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
কেন পিএইচডি ডিগ্রিধারীরাও পিওনের চাকরি চাইছেন?
সরকারি পিওনের চাকরিতে এমন কিছু সুবিধা রয়েছে, যা বর্তমানে ভারতের কর্মসংস্থানের বাজারে ক্রমশ মূল্যবান হয়ে উঠছে। যেমন—চাকরির নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট মাসিক বেতন এবং পেনশনের সুবিধা।
অন্যদিকে, বেসরকারি ক্ষেত্রে অনেক চাকরিতেই কম বেতন, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষিত কোনও প্রার্থীও নিজের যোগ্যতার তুলনায় অনেক নীচের স্তরের চাকরিকে বেশি বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে মনে করতে পারেন।
অর্থাৎ, পিওনের চাকরির জন্য পিএইচডি বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের আবেদন করাকে শুধুমাত্র হতাশার ফল হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা বোঝা যাবে না। স্থায়ী আয় এবং চাকরির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেও তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এই পরিস্থিতি তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপরও প্রভাব ফেলছে। আজকের কোনও পড়ুয়া শুধু একটি নির্দিষ্ট ডিগ্রি অর্জন করেই নির্দিষ্ট ধরনের চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা ধরে নিতে পারেন না। আগের প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই ধারণা তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ছিল।
তবে তার মানে এই নয় যে ডিগ্রির কোনও মূল্য নেই। গড় হিসাবে, উচ্চশিক্ষা এখনও বেশি আয় এবং ভালো চাকরির সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। কোনও ডিগ্রি না থাকার তুলনায় ডিগ্রি থাকা এখনও অনেক ক্ষেত্রেই সুবিধা দেয়। কিন্তু এখন শুধু ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। চাকরি পাওয়ার জন্য আরও অনেকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। ফলে ডিগ্রি আর সাফল্যের শেষ ধাপ নয়, বরং প্রতিযোগিতার প্রথম ধাপ হয়ে উঠছে।
এই সমস্যার আরও একটি দিক রয়েছে। কোনও পিএইচডি ডিগ্রিধারী যদি পিওনের চাকরি করেন, তাহলে তাঁর অর্জিত বিশেষ জ্ঞান এবং গবেষণার অভিজ্ঞতা সেই কাজে ব্যবহার করার সুযোগ খুবই সীমিত।
এটি শুধু ওই ব্যক্তির ক্ষতি নয়, দেশের পক্ষেও একটি বড় ক্ষতি। কারণ একজন গবেষককে তৈরি করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারও অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করে। অথচ তাঁর অর্জিত জ্ঞান যদি উপযুক্ত কাজে ব্যবহার না করা যায়, তাহলে সেই দক্ষতার বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। অর্থাৎ, সমস্যাটি শুধু একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষের প্রত্যাশিত চাকরি না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং দক্ষ মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহারের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
একেবারেই তা নয়। এই ঘটনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কোনও কারণ নেই যে ডিগ্রির মূল্য শেষ হয়ে গিয়েছে বা উচ্চশিক্ষা অর্জনের আর কোনও অর্থ নেই।
বরং বিষয়টি হল, শিক্ষা এবং চাকরির মধ্যে সম্পর্ক এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। একটা সময় ডিগ্রিকে প্রায় চাকরির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হত। এখন সেটি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা হলেও, একা আর যথেষ্ট নয়।
তাই ভবিষ্যতে কী পড়াশোনা করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তরুণদের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি। কোন বিষয়ে পড়লে কী ধরনের চাকরির সুযোগ রয়েছে, সেই ক্ষেত্রের চাহিদা কেমন এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কতটা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি, প্রথাগত পড়াশোনার সঙ্গে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ডিগ্রিকে সাফল্যের চূড়ান্ত ধাপ না ভেবে ভবিষ্যৎ গড়ার শক্ত ভিত হিসেবে দেখা উচিত।
সবশেষে, কোনও উচ্চশিক্ষিত তরুণকে তাঁর যোগ্যতার তুলনায় অনেক নীচের স্তরের চাকরি করতে দেখলে তাঁকে নিয়ে সহজে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। বরং প্রশ্ন করা দরকার, দেশের শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা যত বেড়েছে, তাঁদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ কি সেই অনুপাতে বেড়েছে?
উত্তর প্রদেশে মাত্র ৬২টি পিওন পদের জন্য ৯৩ হাজারেরও বেশি আবেদন এবং সেই তালিকায় হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত মানুষের উপস্থিতি সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: The Wire এবং Millennium Post-এ উত্তর প্রদেশের পিওন নিয়োগে আবেদনকারীদের সংখ্যা, পিএইচডি ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের তথ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদন। পাশাপাশি, ভারতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে অসামঞ্জস্য নিয়ে International Labour Organization (ILO) এবং Institute for Human Development-এর India Employment Report 2024।